নিশিরঙের আলপনা

নিশিরঙের আলপনা
//পীযূষকান্তি বিশ্বাস



রাত শব্দটিতে একটি কানা লেগে থাকে । অন্তত: যখন দেখতে চেয়েছি তাঁর রূপ , পৌঁছাতে চেয়েছি নিকটে, অধরা রয়ে গেছে ।  চটকাতে চেয়েছি তাঁর অপার , মুঠো থেকে পিছলে গেছে । গৃহে থেকে সেই সব হয় না অর্থাৎ  রাত দেখা যায় না । তবুো উঁকি মেরে  যখনই তাকিয়ে দেখেছি জানালার ওপারে, বরং পেয়েছি আবার একটি জানালা । তার কপাট সহ, সমস্ত দৃশ্যই যেন তালা মারা । নিরেট ও বদ্ধ ।  কোনটিই খোলা নেই । লোকে বলছে টর্চ ফেলো । আলো হলো তার একমাত্র চাবি ।  রাতের ওপারে পৌঁছাবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা জারি । প্রতীত হয় অন্ধকার একটি ছিটকানি মাত্র । আলো দিয়ে তা খোলা যায় না । রাত একটা মনু । অন্ধকার একটা অন্তর । এই সব ফারাক  বুঝতে বুঝতে এই এতোগুলো দশক চলে গেলো । 

২ 

যেখানে উত্তাপ বুঝতে চেয়েছি , দেখতে চেয়েছি প্রেমঝর্ণার সফেন সেখানে রাত্রির শীতল প্রবাহ বরাবর আমাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে । একটি দ্যাখা, কোন দিন পাঠ্য হয়ে হয়ে ওঠে না । রাত কোন দিন অন্ধকার হয়ে ওঠে না । রাত নিজে শুধু দুর্বোধ্য নয় , বলা যায় নিরেট অথবা বলা যায় অপার ।  তার ধ্বনিসমুদ্রে কান পেতে দ্যাখো, তা পাঠের অতীত। তার সূত্রসমূহ উদ্দাম, তার গতিঅভিমুখ উভয়গামী । তার শব্দবিন্যাস ভীষণভাবে সাংকেতিক। এতোসব জেনেও ঢাল, তলোয়ার, অন্ত্যমিল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি তার উপকণ্ঠে । আলো ডাকছে অনবরত । প্রতিনিয়ত শুনছি, দেখছি তার হাতছানি। এই বোধ আর বধিরতা দিয়ে তার ধ্বনিকাব্য ব্যাখ্যা কি করে করি ? এই রাত আর গোপন নিয়ে আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে , আমি তার ভিতর দুইটি তারার জন্ম অনুধাবন করি । একটি তারা, দুটি তারা, আর ঐ তারাটির বউ মরা । আমার ভিতরেই  রাত আসে এবং রাত যায় । আমি মুঠো মুঠো অন্ধকার নিয়ে গলির মুখে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকি ।


ওপারে ডেকে ওঠে কেকা, আর এপারে আমার একটা সামান্য রাত্রি হলো । বোধের ওপারে জেগে থাকা আর একটি একা ডেকে উঠলো । উৎসব আর আলোকলিপিকার আড়ালে এক রাত্রি জেগে ওঠে । আমি শুধু তার আঁধার চেয়ে দেখি । কাজল বড় কালো । যেখানে এই রাত্রিও খুঁজে নিতে চায় একটি স্থির নক্ষত্রবাস । আমি সেই ছায়াময়ের কাছে রাখি আত্ম নামের নিশিলিপিকা । আমার শোনা হয়নি কোন কুহু, আমার বাজানো হয়নি সে বাঁশী । এই তৃষিত ময়ূরকে আমি কোথায় রাখি ?  আরাবল্লি উপরে ঐ ডুবে গেলো আগস্টের এর চাঁদ । এই বুঝি রাত্রি শেষ হয়ে আসে ।  বোধের ওপারে নীল হয়তো হয়ে উঠেছে অধিকতর নীল , ঐ ঘনবিথীকা বুঝি হয়ে উঠেছে সবুজতর , আমি এই মঙ্গারের কাছে ঝাউবনের মতো কিছু, অথবা ঝাঁটীবাবলা হবে , তাই নিয়ে বেশ খুশী আছি । বালি-কাটা চট্টানে  ধাক্কা খেয়ে আসা এই শাইশাই বাতাসে আমি তার ধ্বনিতরঙ্গ অনুধাবন করি । হয়তো আমাকে ডাকছে কোন পরাধবনির ইন্দ্রজাল , নিস্তব্ধতার আঁধারযাপনে যে কোন রাত্রিই একমাত্র হতে পারে যার সহোদরা ।


নিশিযাপনের খিলান উঠে গেছে । এই দেওয়াল জুড়ে সেই সমূহ আলপনা । পাঠকের কাছে পৌঁছাতে না পারা সেইসব পঙক্তিমালা আমাকে জাগিয়ে রেখেছে । দেওয়াল আর দিল্লি, একে অন্যকে টক্কর দিচ্ছে ।  আমি তার ঘমাসনের রাত্রি লিখি মাত্র । দেওয়াল কোথাও পৌঁছাতে চায়না । খিলান ও চায়না কোন উচ্চতা । এই সামান্য সাময়িক প্রতিষ্ঠা, তাকে কি দিতে পারে ? কাছাকাছি বন্যপ্রাণীদের ছোটাছুটি দেখি । জসোলাভাট্টি অভয়াঅরণ্য কাছাকাছিই হবে । দৌড়ের প্রতিযোগিতায়  চিতা ও সারমেয় যে যার নিজের অবস্থানে শিল্পীর মতো ভাস্বর হতে চেয়েছে । এই কলাসমারোহ, এই মেলানো মাত্রাবৃত্তের ছন্দে তবুও পাল্টে গেছে ফরিদাবাদ । ঘরে ফিরে গেছে ডানা ঝাপটানো সমস্ত পাখি । এক নিশিযাপনের আলপনা  নিয়ে অপার দিল্লি জেগে আছে । আমার শোনা হলোনা সেই লক্ষীপ্যাচার ডাক যখন হিম বিছানায় তাকে ডেকে নিতে চেয়েছিলো অনন্ত সঙ্গোপন ।


রাত্রি আমাকে ডেকে বলে, তুমি একলা হতে পারো  তবে সঙ্গীবিহীন নও ।  এই দেখো আরাবল্লি, এই দ্যাখো স্থবিরতা, আর এই দেখো তার নৈশবিহার। এই পত্রালিকায় তুমি অক্ষর রাখো ।  এই গহনে তুমি মুখ রাখো । আমি তার চোখে চোখ রেখে তার দেওয়ালের ধড়কন পড়ি । দেওয়ালের পর দেওয়াল । ঘনবিথীকার অর্জনগড় পার করে দপ করে জ্বলে ওঠা গুঁড়্গাও ।  দেখি , ভূমির কাছে তার দেওয়া অঙ্গীকার,  ছাদের কাছে দেওয়া বিশ্বাস , আর চিত্রের কাছে দেওয়া তার দেওয়াল । ভরা ক্যানভাস । রং আর রং ।  তাতে ঠিক কোন দৃশ্য নেই  । নাকি, আমি তা দেখতে পাচ্ছি না ?  যা দেখি , তা এক কালযাপনের বিশ্রামাগার । নিকষ কালো ঘুম নিয়ে ঘিরে থাকা শিথানপ্রদেশ  । দেখতে থাকি , শয়নকক্ষ ভেদ করে অলক্ষ্যে কখন যে গ্রানাইটপাথরের সুউচ্চ খিলান উঠে গেছে ।


যে কোন রাত্রি হতে পারে নৈশপ্রিয়া, আমি যার নগ্ন পায়ের নূপুর খুঁজে ফিরি । আমি তার অনিন্দ্য মুখের মুখড়া হবো ।  আমি  হবো সুষমপরবের মাত্রাবৃত্ত । আমি হতে চাই উতলা বাঁশের মুখরবেণুকা, কৃষ্ণকলির ছন্দগীত। মুহূর্মুহ গুঞ্জিত হতে চেয়েছি বাচিকের কণ্ঠমালায় ।  জানি এই যাপনচিহ্ন কোন বেহাগ হতে পারেনা । তবু  এই রাত্রির চুম্বনে আমি রেখে যাই জুলাইয়ের ইমন । একলা দাঁড়িয়ে থাকা ঐ ল্যাম্পপোস্ট লক্ষ্য করে উন্মাদের মতো হটাৎ চিৎকার করে বলে উঠি 'আলো' ।  ঈষৎ কুছঝটিকায় কারো যেন ওড়না উড়ে যায় । মেহরলী মানে অশ্বখুরে উড়িয়ে দেওয়া এক পৃথ্বীরাজ , আমি জানি এখানে তাঁর গোপন রাত্রিগুলো শায়িত রয়েছে । ছড়িয়েছিটিয়ে ভেরেন্ডার বনে দিল্লির জন্ম নিয়ে সেজে উঠেছে নির্মেদ বাক্যমালা ।  কিঞ্চিত অন্ধকারে দুর্বোধ্য লাগে গুল্মলতার সিন্ট্যাক্স  ।  রাতের কুতুবমিনার নিজেই এমন একটি বাক্য যার কাছাকাছি বহুকাল কোন ক্রিয়াপদ নেই । 



এমন একটা রাত্রি  তুমি যাচ্ঞা করোনা । এই বিপণ্ণতা তুমি বোঝো । তুমি দেখতে চাও প্রয়াস আর নিষ্ফলতার কনট্যুর ও মেপে নিতে চাও তার গ্রাফ । তুমি ভালোবেসে ফেলেছো লালডোরার মানচিত্র ।হাতে তুলে নিয়েছো আমির খসরু আর খুঁজে চলেছো ক্রমশ নাগরিকে মিশে যাওয়া যমুনার যৌবনরেখা । তার উপরে নিভে যাওয়া নক্ষত্র দেখে তুমি হতাশ হয়েছো  অথচ তোমার চোখের উপর যে জ্যোৎস্না পড়ে , তুমি সেই স্নেহ বোঝো নাই । তোমার হৃদয়গোপনে যে অন্ত্য ছিলো, তুমি তার মিল খোঁজো নাই ।  হে তুঘলকাবাদ, আমি দুঃখিত তোমার এই ভিরানায় কোন কবিতাবৃক্ষ নাই । এই জানুয়ারির শীতে তবু দ্যাখো আকাশে চাঁদ উঠেছে ।  কি আছে এই জ্যোৎস্নায় ? এই বদরপুর জুড়ে বিছিয়ে থাকা নিশিবাস্তবতা, তাঁর উপকণ্ঠে তুমি যেন আত্ম হয়ে জমে আছো । জানি তুমি নিজেই হয়ে উঠতে চেয়েছো অন্ধকার, আর যেহেতু তুমি জেনে গেছো আসন্ন প্রভাতফেরীর আগে তুমি আমি দুজনেই পৃথিবী থেকে মুছে যাবো অক্ষরে অক্ষরে ।