আছি-নিশ্চুপে

পীযূষকান্তি বিশ্বাস 


বেঙ্গলী কলোনি , মহাবীর এনক্লেভ


নিউ দিল্লি - ১১০০৪৫


ফোন: ৯৮৭১৬০৩৯৩০






জঙ্গল



এত বিন্যাস ও ব্যাকরণের বেড়াজাল পেরিয়ে শেষমেশ শব্দ, শব্দের আওয়াজে বেজে ওঠে ।  কাল, সন্ধি, বিভক্তি সহ, দক্ষিণ ,উত্তর, উপরিপর আঞ্চলিকতায় সমস্তই তার চুরচুর করে ফেটে যায়। যদিও উল্লসিত ধ্বনিসমূহ,  প্রগলভতা, মেহফিলে সেজে ওঠা ছন্দসমেত সেও মিশে যায় শব্দের স্বচ্ছতায় । যে ভাবে ঝোপের নিশ্চুপে  ঝাঁটী বাবলার ছায়ায় লজ্জায় ফুটে ওঠে বাংলার ভাঁটফুল । তার লাবণ্য নিয়ে সংশয় ছিলোনা স্বয়ং স্বর্গরাজ্য ইন্দ্রের । যেহেতু তাকে ফুল নামে ফুটে উঠতে হয়, তাকে মানুষ হয়ে উঠতে হয়, বিয়ে, শাদি, শ্রাদ্ধ ও ভ্যালেন্টাইনে তাকে হয়ে উঠতে উপমা ও অলংকার , প্রতীত হয় মনুষ্য দুনিয়ার ব্যাকরণে সে মিস ফিট, জংলা,  আদিম ও  গেঁয়ো । নিয়মে কানুনে তাকে বারবার ঘিরে ফেলা হয় তুলনায়, পরিমাপে এবং লজ্জায় । বরং অরণ্য, এমন একটি জায়গা , ভাঁটফুল সেখানে নিরাপদ মেহসুস করে । এই সীমানায় কখন যে হেমন্ত আসে, কখন যে কোকিল ডেকে যায়, তা নিয়ে পোস্ট, গ্রুপ, ব্লগ বা লিটল ম্যাগাজিন নেই । কোন তর্ক ওঠে না ।  এই বোধ ও মগ্নতার সীমানা পারে কখন যে নিসর্গ ফুটে ওঠে ,তা দেখতে স্বয়ং জ্যোৎস্না থমকে দাঁড়ায় ।  নাম না জানা - সেই গুল্ম, অথবা বীরুত এভাবেই থমকে দাঁড়িয়েছিলো অবধের মালঞ্চ লতা, পালামৌএর বন-ধুতরা । তাকে জংলী বলে অভিধান বারবার সংজ্ঞায় বাঁধতে চেয়েছে । ব্যাকরণে বাঁধতে চেয়েছে তাঁর বন্য চলন ।  




হে, মনুষ্য, বন্য কি ? কে দিতে পারে এর উত্তর । আমি, সেই ছাত্রটিকে কোথাও দেখছিনা যে একবার প্রশ্ন করবে  জঙ্গলের অর্থ কি ? কাকে ঠিক জঙ্গল বলা যায় । হে, হোমো সেপিয়েন্স আপনি বলতে পারেন ? হে প্রাণীশ্রেষ্ট, বলুন তো জঙ্গল মানে কি ? 




"আজ্ঞে, জঙ্গল হলো সেই জায়গা যেখানে বাঘ থাকে" ।  বললেন সে আচার্য । এবং বাঘ নিজেই একজন জঙ্গলের সদস্য, এই ইকো-সিস্টেমে, তার অন্য কোন রোল নেই । সে বরং একজন আম-জনতা । তার খিদে পায়, যৌনতা আছে । নাক, মুখ, দাঁত, থাবা, নখ,  ঠ্যাং এবং লিঙ্গ ভেদে নুনুর আকার ভেদ আছে । এমতাবস্থায়, যেন সেই একমাত্র বলতে পারে, আমি আছি । বাকি সবাই সন্ত্রস্ত । অথচ, নিজস্ব এই অস্তিত্বের প্রয়োজনে তাকে শিকার করে খেতে হয় । এবং ডেফিনিটলি,  সে একজন সমাজসেবক নন । একজন হরিণের প্রাণ বকসে দিলে, তাঁর আহার জোটে না । এহেন পরিসরে, একজন বাঘ যদি একটা একটি খরগোশ শিকার করে কামড়ে কামড়ে তাঁর মাংস ছিঁড়ে খান । মানুষ বলে ওঠে জঙ্গলরাজ । সে জঙ্গলের সংজ্ঞায় কতিপয় বাঘ ভাল্লুক বা হায়নারা বার বার হানা দেয় । 




হে আচার্য, জঙ্গল কি তবে একটা ইকোসিস্টেম ?  এখানে বৃক্ষের কোন ভূমিকা নাই ? হে, বিভূতিভূষণ আপনি বলতে পারেন অরণ্য কি ? হে উইকিপিডিয়া আপনি দিতে পারেন  জঙ্গলের সংজ্ঞা ?  




"আজ্ঞে, জঙ্গল হলো সেই জায়গা যেখান থেকে কাঠুরী কাঠ সংগ্রহ করেন, মৌয়াল সংগ্রহ করেন মধু " । ব্লগার লিখলেন, "যেখানে পর্যটক ঘুরতে যান, উড়ে যাওয়া প্রজাপতির ছবি তোলেন ।ঈষৎ উচ্চ থেকে  ঝুলে পড়া বেগুনী আঙ্গুর গুচ্ছ দেখে শৃগাল চেঁচিয়ে ওঠেন, আঙ্গুর ফল টক "  ।  




এ এক আশ্চর্য ব্যাকরণ , যারা শিখেছে, মুখস্থ করেছে , তাদের কাছে জঙ্গল খানিকটা জলের মতো ।  তারা বুঝে গেছে তৃণমূলের ব্যাবহার, শিখে গেছে বাবলার কাঁটা থেকে কিভাবে নিজেদের গা বাঁচাতে হয় । রোদ, খরা, মহামারীতে বারো মাসে তাদের একটি দুর্গাপূজা ঘুরে আসে । তাদের কাছে গেন্দাফুল হলুদ হয়ে ফোটে, পলাশ লাল হয়, ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া উড়ে যায় সবুজাভ অক্ষর বিন্যাসে । 




এভাবেই, এতোটা বেলা গেলো । তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ বিস্তার আন্দাজ করে । আমি ভাবি, এই ভাবে বিবর্ণ হয়ে গেছে লাল-পাহাড়ি , পাথর হয়ে গেছে রাঙ্গামাটির গাঁ । বেলা বেড়ে যায় । তার রং ও পরিণামে আমি যে অনিশ্চয়তা দেখি, দেখি ফেলে আসা আয়তনে বেড়ে উঠেছে আমার জন্মভূমি । তার ভৌগলিকে নিজেকে মিসফিট দেখি । এই দূর দিল্লিতে তার জন্মগন্ধ খুঁজি  আর দেখি লুপ্তপ্রায় তার নিজস্ব শিকড় । জল ছাড়া, যত্নছাড়া বেড়ে ওঠে ভেরেণ্ডা গাছকে দেখি । দেখি - পাতা মেলে সে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে , প্রতিযোগিতায় বেড়ে ওঠা মনুষ্যনির্মিত বহুতল আবাসনের দিকে ।  খাদ্য, খাদক, লেখা, লেখক, বই, প্রকাশক, বইমেলা চত্বর সমস্তই তো প্রতিযোগিতা । এই প্রতিযোগিতায় , এই ভাবে আত্মসমর্পণ করার আগে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একবার গভীর শ্বাস নিয়ে ভেবে দেখি । আছি ?  কংক্রিট আর পাকা ইটের ব্যাকরণে  এই মহানগর নিজেই কি একটা জঙ্গল নয় ? 




হুম !




আছি । ইহজঙ্গলেই আছি । নিশ্চুপে, স্তূপে, ভূগোলে । ইতিহাস ক্লিশে হয়ে গেছে । অনন্ত অরণ্যের কাছে একটা ট্যাগ হয়ে, হ্যাস হয়ে, হাইপার টেক্সট হয়ে । থেকে যাবো অপরিচিত অক্ষর ধারায় , অলক্ষ্যে  ও অন্তরালে । এখনো চাঁদ ডুবে গেলে, তাঁর প্রধান আঁধারে ফিরে আসে বৈশাখী । দশমিক শেষে রিপিটেড সংখ্যার অবস্থানে ফিরে আসে শূন্য । হোয়াট ব্লসোমড, দ্যাট রিমেনস । শূন্য ও রয়ে যায় ।  পুষ্পশ্রেনীর দৃশ্য আর শূন্যের কোলাজ আমাকে অবাক করে । সে রঙে প্রকট হয় । সহস্র হরিয়ালী ও পল্লবরাজীর বিন্যাসেও সে তার নিজস্ব রূপ ও গন্ধে হয়ে ওঠে ফুল । ফুলকে ফুটে উঠতেই হয় । এত জঙ্গল চারিধারে, তার অজস্রতায়, এত সহস্র ফুলের ভিতরে এতটা-কাল তাইতো আমি, আমি হয়ে ফুটে উঠতে চেয়েছি নিজস্ব পাপড়ি ও পুংকেশরে ।