জালাহাল্লি সেন্ড অফ

  সেই ১৯৯৩, ১৬ ফেবরুয়ারী । এমসিও এক একট্রেন বগি বুক করে দিয়েছিলো, ছুটে চল্লাম জালাহাল্লি, ব্যাঙ্গালোর । মনে পড়ে একটা চিঠির কথা, মিলিয়ে মিলিয়ে ছন্দে অনেক চিঠি আমি তখন লিখতাম । সাথে ছিলো জয়দেব, কুনাল, পলাশ , পুলক , পার্থ, প্রলয়, প্রসেনজিত, ক্ষিতীশ বিকাশ, সুনীল, সুধীর, সন্দীপ ও দেবজিত । বুক দুরু দুরু, আঠারোর ছোঁয়া তখনো অনেকেই পাইনি , নাকের নীচে তখনো ঘাস জন্মায় নি , আমাদের রৌদ্রের সমুদ্রে ফেলে লেফট রাইট করিয়ে নিতো জিটিআই । বাজ্ঞা, আদিত্যেন, সার্জেন্ট মারোয়াড়ী আমাদের কমান্ড শেখাতো । সেইদিন আমাদের কে বেঁধে ফেলল এক অজানা বন্ধনে । কেউ কাউকে চিনি না, কিন্তু কি কেমেস্ট্রি ! যেন কত বছর ধরে চিনি একে অপরকে । আমাদের এই বন্ধুত্ব প্রাতিষ্ঠানিক কিন্তু সেই সাথে আ-রক্তের, আমাদের সেই প্যারেড গ্রাইন্ড এক লাইনে দাঁড় করিয়েছিলো, আমরা সমান হয়ে গেলাম ।


বন্ধু

    সুজন সেই আমাদের কিশোর পারে মনের মেলা

দুদিন লাগি ভালোবাসা দুদিন পরেই বিদায় বেলা ।

সেই যে কবে আঁধার পথে ঘর ছেড়েছি একলা পথিক

দূর অচেনার হাতছানি কার আহ্বানে কার নৈস্বর্গিক ।

জয়দেব কুনাল পলাশ পুলক পার্থ প্রলয় প্রসেনজিত

ক্ষীতিশ বিকাশ সুনীল সুধীর সন্দীপ ওঝা দেবজিত ।

বন্ধু সুজন একলা পথেই সেই আমাদের পরিচিতি

মনে পড়ে প্রথম সেদিন স্বপ্নে ভরা পলতা বীথি ?



হৃদয় নদী উজানে বয় ভাসিয়ে নিয়ে আশার ভেলা

মনে পড়ে অচেনা ঘর অচেনা পথ বিদায় বেলা ?

জীবন চলে এঁকে বেঁকে ঝিক ঝিক ঝিক গরম চায়ে

দিকদিগন্ত ছুটে চলে সার বাঁধা গাঁও ডাইনে বায়ে ।

নদনদী আর দেশবিদেশের বসন আসন বিহার আহার

যায় হারিয়ে একে একে ভাই বন্ধুদের মিল ব্যাবহার ।

এমনি করেই যেন হঠাৎ বুঝে উঠতেই জীবন প্রীতি

দুদিন লাগি পান্থশালায় সেই আমাদের উপস্থিতি ।


সেই আমাদের পথ চলা আর পথের ঢেলা পায়ে ঠেলা

হয়তো পথের ছাউনি তলেই বিদায় নিতে বিদায় বেলা ।

সোনার বিকেল মাটি করে সেই আমাদের রৌদ্রে ছোটা

ঘাসে বসা সাঁঝের কোলে চায়ের আসর জমে ওঠা ।

পাথর বাঁধা একই মাঠে বাম ডান বাম মন্ত্র গাওয়া

একই ঘরে আড্ডা শেষে গভীর রাত্রে ঘুমিয়ে যাওয়া ।

রাত্রি শেষে সেই পুনরায় নবদেশের নিয়ম নীতি

তবু বুকে বিশ্বাসী শ্বাস পেয়ে চলি জীবন গীতি ।


আসা যাওয়া মেলামেশা ভুলে যাওয়া হারিয়ে ফেলা

মনে পড়ে বারে বারে দিবস শেষে বিদায় বেলা ।

জানি না কেউ রাখবে মনে পাহাড় কোলের জীবন খানি

নতুন করে এমন সাথী পাবো আবার তাই কি জানি ?

সবাই যাবে সবকে ছেড়ে সবাই হবে আবার একা

জানি না ফের কোথায় হবে আদৌ বা ফের হবে দেখা ।

যাই বন্ধু যাই, বিদায় বন্ধু ! চিরন্তন এই স্বপ্নতিথি

পুরোনো গান স্মৃতিগাথার সঙ্গ ছেড়ে চলি

  ইতি ।


এই চিঠিটি লিখেছিলাম এয়ারফোর্স ট্রেইনিং এর শেষদিন । যেদিন চোখের জল সহ পরস্পরের কাছ থেকে ছিলো বিদায় নেবার দিন । কারন ঐ দিন আমরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ছাউনিতে চলে যাই ।