মঙ্গারকথা

মঙ্গারকথা

nপীযূষকান্তি বিশ্বাস

মঙ্গার অরণ্য শহরের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে—যেন সময়ের গায়ে লেগে থাকা এক সবুজ দাগ। আমি এখানে একা। না, একা বলা ঠিক হবে না; গুল্মলতা, বটের শিকড়, পাখিদের অবাধ যাতায়াত—এরা সবাই আমার সাক্ষী। শহরটা পিছনে ফেলে এসেছি, কিন্তু তার শব্দ এখনো কানে লেগে আছে। অদ্ভুত ব্যাপার—এখানে এসেই প্রথম টের পেলাম, নিস্তব্ধতা আসলে কত জোরে কথা বলে। পাতারা আমার সঙ্গে ফিসফাস করে। তারা বলে, "তুমি যে প্রশ্নগুলো মুখে উচ্চারণ করতে পারো না, সেগুলো আমরা শুনেছি।" আমি অবাক হয়ে ভাবি—আমি তো কিছু জিজ্ঞাসা করিনি! কিন্তু অরণ্য জানে, মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোর ভাষা। হয়তো সে-ই আমাকে শেখায়, প্রশ্ন করার আগেই উত্তর পাওয়া যায়। একটা পাথরে বসে আছি। পা ডিঙিয়ে বেরোচ্ছে শ্যাওলা। স্পর্শ করতেই মনে হয়, এটা শুধু শ্যাওলা নয়, এটা সময়ের আস্তরণ। হাজার বছর ধরে কত মানুষ এই পাথরে বসেছে? কতজন আমার মতো একাকীত্ব খুঁজে এসেছে? অরণ্য তাদের সবাইকে মনে রেখেছে। আমি যদি প্রশ্ন করি, "আমি কেন এত alone?"—হঠাৎ একটা হাওয়া এসে শিউলি ফুলের গুচ্ছ ঝরিয়ে দেয়। বুঝতে পারি, প্রকৃতি বলে দিচ্ছে—"একাকীত্ব তো তোমার ভুল বোঝা। আমরা আছি।" আমি ভারতীয় দর্শনের বই পড়ি। অদ্বৈত, সংখ্য, বৌদ্ধ মত—এসবের জটিল তত্ত্ব মাথায় ঘুরপাক খায়। কিন্তু অরণ্য তো কোনো গ্রন্থ খোলে না। সে তার ডালপালা বাড়িয়ে দেয়, পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ নামায় মাটিতে, পিঁপড়েদের লাইন টেনে নিয়ে যায় অদৃশ্য গন্তব্যে। এটাই কি তার উত্তর? এই সহজ সত্য যেজীবন তত্ত্বের চেয়ে বড়?ফিরে যাবার সময় হয়। পেছনে তাকাই—অরণ্য যেন ম্লান হাসে। সে জানে, আমি আবার ফিরে আসব। কারণ, শহরের ভিড়ে যেখানে 'আমি' হারিয়ে যায়, মঙ্গার অরণ্যে এসেই শুধু টের পাই—'আমি' কে।

 

শহর ফুরিয়ে আসে এখানে, তার সব ব্যস্ততা, কৃত্রিম আলোর ঝলকানি,
থেমে যায় মঙ্গারের সবুজ সীমান্তে এসে। এ এক নিস্তব্ধতার দ্বীপ, কোলাহলের সমুদ্র মাঝে। পা রাখি নরম মাটিতে, পাতার স্তূপে। বাতাস বয়ে আনে ধূলিকণা আর এক আদিম গন্ধ। দূরে সরে যায় মানুষের স্বর, গাড়ির হর্ন, কাছে আসে নিজের শ্বাসের শব্দ, আর গাছের ডালে বসা কোনও অচেনা পাখির ডাক। এখানে দাঁড়িয়ে আছে রুক্ষ ধাউ , যার সহিষ্ণু শরীর যেন সময়কে সাক্ষী রাখে।
খেজরির কাঁটার বুনোট ভেদ করে আলো এসে পড়ে মাটিতে, যেন কঠিন বাস্তবের মাঝেও টিকে থাকা আশার রেখা। হয়তো কোনও শুকনো মান্দার ভাবে  তার বসন্তের কথা, সেই টকটকে লাল ফুল, যা জীবনের ক্ষণস্থায়ী অথচ তীব্র সৌন্দর্যের প্রতীক। বাবলার জটিল শাখাপ্রশাখা, যেন চিন্তার অজস্র পথ, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল? এই নিস্তব্ধতায় প্রশ্নরা ভিড় করে মনে – এই যে আসা-যাওয়া, এই যে টিকে থাকা, এর অর্থ কী? শিকড় যেভাবে আঁকড়ে ধরে মাটি, আমরাও কি সেভাবেই কোনও সত্যকে আঁকড়ে বাঁচি? নাকি সবই মায়া, এই সবুজ আচ্ছাদন, এই প্রশান্তি? পাতার মর্মরে কোনও উত্তর লেখা নেই হয়তো,আছে শুধু সেই স্পন্দন, যা জীবনের উৎসমুখে শোনা যায়।


এখানে বসে, মনে হয়, আমিও সেই অরণ্যের অংশ, তার নীরব জ্ঞানের এক ক্ষুদ্র পড়ুয়া মাত্র। শহর অপেক্ষা করে, আমি এখানে খুঁজে পাই নিজেকে, মাটির গভীরে, গাছের আত্মায়। শহর যেখানে তার শেষ নিঃশ্বাস ফেলে, শুরু হয় মঙ্গারের আদিম সবুজ – এক নীরব জগৎ, যেখানে সময়ও যেন থমকে দাঁড়ায়। এখানে এসে দাঁড়ালে, কোলাহল সরে যায় পর্দা সরানোর মতো, ভেতর থেকে উঠে আসে কিছু পুরনো প্রশ্ন, উত্তরহীন, তবু অনিবার্য।

ঐ যে দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা বৃক্ষ, সরল, ঋজু, আকাশের দিকে তার একাগ্র দৃষ্টি – সে কি ধ্যানের প্রতিমূর্তি? শেখায় স্থিরতার পাঠ? নাকি শুধুই টিকে থাকার এক মৌন জেদ? কিছুদূর হেঁটে গেলে দেখা মেলে লতানো গুল্ম জড়িয়ে ধরেছে অন্য গাছকে, এ কি নির্ভরতা? নাকি শুধুই বেঁচে থাকার কৌশল? জীবনের এই অমোঘ পরনির্ভরশীলতার মতো –একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেড়ে ওঠা, অথবা শ্বাসরোধ করা?

কোনও এক প্রকাণ্ড ছায়াতরুর নিচে বসে ভাবি, তার অজস্র ডালপালা, অসংখ্য পাতার ভিড়, যেন আমারই মনের হাজারো চিন্তা, জট পাকানো অনুভূতি। কোনটা ছায়া দেয়, কোনটা আলো আড়াল করে? মাটিতে ঝরে পড়া শুকনো পাতা পায়ের নিচে মরমর করে ওঠে, যেন বলে যায় – শেষ মানেই সমাপ্তি নয়,রূপান্তরের এক নতুন শুরু। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুন পত্রপল্লবের অপেক্ষা। এখানে দাঁড়িয়ে, এই সবুজ নিস্তব্ধতায়, মনে হয় গাছেরা কেবল সাক্ষী নয়, তারা যেন জীবন্ত দর্শন। শিকড়ে তাদের মাটির টান, আকাশে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা – এই দুইয়ের মাঝে দোল খায় আমাদের চেতনাও। মঙ্গারের বাতাস উত্তর দেয় না, শুধু প্রশ্নগুলোকে আরও গভীর করে তোলে, আর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার একটা শান্ত অবকাশ বুনে দেয়।

 

 

 

 

 

 

 


 

আমন্ত্রণ

 

যেখানে শহরের শেষ রাস্টাটি 

সরু হয়ে আসে

আমি দেখি আর একটি রাস্তা 

 আর একটি যাপন 

 এই ঝাঁটি বাবলার বন

ক্রমশ তার ঘন হয়ে আসা 

অরণ্যের কথা

মনময় মঙ্গারের রাজ্য
যেখানে কংক্রিটের শিকড় ছিঁড়ে
আকাশে দুবাহু মেলে দিয়ে 

প্রকাশ্তি হয়ে আছে বটের প্রার্থনা!

এখানে সময় নিয়ে কিছুক্ষণ 

সদ্য ফুটে ওঠা কিশলয় ফাঁকে 

বাবলার ফুলের কাছে এসে

ঝিকিমিকি করি ।

তার নিজের মতো করে ফুটে ওঠা দেখি

শুনি,

মঙ্গারের মগ্নতায় গুল্মলতার ঝোপে

কিভাবে নিঃশব্দে সমর্পন করে‌ বিলীন হয়ে যায়

দিল্লি শহরের গর্জন !


 

ভাষা

 

একটা শালিক ডাকে

বুনো আমড়া গাছের ডালে—
ঠিক আমাদের গ্রামের শালিকের মতো!
অচানক চমকে উঠেছি তার ডাক শুনে
এই পাখি তো বলছে—
'ভালো আছো?' 

ভালো আছো যেন কেউ

জিজ্ঞাসা করে মাতৃভাষায়!

আমার চোখে তো জল,

দেশ, আজ তো বহু ক্রোশ দূর

আর মা তো আজ বহু বছর হলো
চলে গেছেন সময়ের ওপারে!

ঝোপে আড়ালে

মনময় মঙ্গার বলে ওঠে

মায়েরা কখনো কোথায় চলে যায় না,
শুধু বদলে যায়

তাদের দেখা দেওয়ার ঠিকানা! 


 

শিকড়

 

একটি বটের শিকড়ে

হাত রাখতেই
শুনি আত্মমগ্ন ভূগর্ভের সুর—

এখানেই আমাদের বনবিবির থান
চারিদিকে প্রস্ফুটিত এক খন্ড ইতিহাস 

ঝুরিনামা  জ্বরাবৃদ্ধ বট বলে  ওঠে

এই তো!
এই শিকড়গুলোই ধরে রেখেছে
পুরানো দিল্লির সমস্ত স্মৃতি!

আমি অবাক হয়ে ভাবি – কীভাবে ?
গুল্মলতার ঝাড় ব্যাখ্যা করে - প্রতিটি গাছ
একজন জ্যান্ত ইতিহাসবিদ,
যে কথা বলে না,

শুধু শুনে যায় !


 

প্রেম

খেজুর গাছের ছায়ায় বসে ভাবি—

এত ঊর্ধ্বমুখী জীবন মানে কী?

মাথা উঁচু করে আকাশ ছোঁয়ার সাধনা,

ফাল্গুনে ফুটে ওঠা মরশুমি ফুল ।

 

তবু মাটির দিকে ঝুঁকে থাকে

ফল ধরা ভারী ডালগুলি।

 

গুড়গাঁও খানিকটা খেজুর গাছের মতোই—

শিকড়হীন অহংকারে ভরা 

আর মঙ্গার জুড়ে এই আরাবল্লির

সবুজ সৈনিক

মাটির গভীরে তবুও

কী প্রেম লুকিয়ে রেখেছে দ্যাখো

নিশ্চুপে নিটল অঙ্গীকারে  


 

বেদী

ছিটিয়ে থাকে খন্ডহর

আর আরাবল্লির গুল্ম হলুদ হয়ে আসা

ভাঙা একটি বেদীতে বসে
আমাকে মঙ্গার জিজ্ঞাসা করে  - জানো
এই পাথর কতগুলো  যুগের সাক্ষী 

আমি মাথা নাড়ি -  

না! ঠিক জানি না তো
পাখিদের গল্প শুনি মগ্ন হয়ে,

তারা বলে চলে- এখানে
একদিন মোঙ্গল বন্দীদের শিরচ্ছেদ হতো,
তুমি সেখানে আজ
কবিতা লিখতে এসেছো ।


পিপল পাতার নাচ

 

এই যাশোলা ভাট্টি রোডে

স্টক মার্কেটের গ্রাফের মতো

ওঠা-নামা করি প্রতিদিন

সুড়ঙ্গের মতো ঘিরে আসে

সবুজ মেঘমালা

উড়ে যাওয়া ময়ুরের দিকে আঙুল দিয়ে

পিপল গাছ আমায়  পাতা ছড়িয়ে দিয়ে

নাচ করে দেখায় , বলে

"রে যাওয়াই তো পরম নৃত্য!"

সদ্য গড়ে ওঠা খদারপুর দিয়ে

কতো বালি ট্রাক চলে গেলো

আমি মঙ্গারে বসে দেখি

শিখি তার জরা পাতার মহিমা,

যেখানে প্রতিটি পড়ন্ত পাতাই

লিখে যায় নতুন সভ্যতার ইশারা।


 

 

কাঁটা

কিশলয় দেখেছো অনেক,

তাতে তার যাপন দ্যাখোনি

বাবুল গাছের কাঁটায় কাঁটায়

লেগে আছে তার অস্তরাগের ইতিহাস।

 

তবু বসন্তে সোনালি ফুল ফোটে,

যেন বলছে, "ক্ষমাই শেষ কথা, বন্ধু।"

আমি হাত বাড়ালে ফুল দেবো না হয়,

কিন্তু হাওয়ায় মেশানো তার গন্ধ

মনে করিয়ে দেবে—

কষ্ট দিয়েই তো প্রমাণ হয়

রাস্তাটা রাস্তা ছিলো কিনা

ভালোবাসা ঠিক কতো ভালোবাসা

আর অরণ্য, অরণ্য ।


 

 

নীল স্মৃতি

 

মলমূত্রের গন্ধে ভরা ফুটপাথে

একটি জাম গাছ দাঁড়িয়ে আছে

তার আধাপাকা নীল ফল নিয়ে

এই ভাবে ্সুলতানাত,

আকবর কবেই যেন রোড হয়ে গেছে ।

 

ফল পড়ে থাকবে মাটিতে,

কেউ কুড়োবে না হয়তো—

তবু, এই পালি গাঁও জুড়ে

চিকচিক কিশলয়ে

দ্যাখো কত বুনো জামুন কা পেড়

এখনো ফুল  ফুটে আছে ।  

 

মঙ্গারের খন্ডহর থেকে তবুও

চিরসবুজ জাম ঝরে পড়ে

নষ্ট এই শহরের বুকে

যেন একটা

নীল দাগ কেটে দিয়ে যায়।


 

অদৃশ্য নদী

মাটির গভীরে শুনি জলস্রোত—
মঙ্গার আমকে বললো- 

এটাই যমুনার প্রাণ,
যাকে চাপা দিয়েছে শহর!

আমি বিস্মিত,

ভাবি- 

তবে এতো যে বালি লাল,

এতো কি তার রক্ত ...
গুল্মলতার ঝাড় সমর্থন করে- 

বলে,  হ্যাঁ,
প্রতিটি অরণ্যের নিচে
একটি মৃত নদীর দোসর বাস করে!


 

বটের পাতা

 

পিপল গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে

উপনিষদের অক্ষর লেখা

বট ছিলো

অনন্তের আগে ছিলো তার অস্তিত্বে

প্রতিটি নড়নে অদৃশ্য ব্রহ্মের স্পর্শ,

আর আমি কোথা থেকে এলাম?

 

শুধু এক পথিক—

যে এর আগেও প্রশ্ন করতে এসেছে,

উত্তর পায়নি।

পাতা ঝরঝর করে মঙ্গার আমাকে বলে,

এই সব কথাবার্তা থাক্ না অজানা!

পিপলের শিকড়ে জমা হয়েছে

হাজার বছরের ধ্যান

এই একটা সামান্য অরণ্য জীবনে

আমি

অনন্তের কী বা বোঝাবো?


 

 

 

পথিক

সন্ধ্যায় এক ঝাঁক টিয়া উড়ে যায়—
মঙ্গার সে দিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে- 

ওরা যাচ্ছে
নিজেদের গ্রামে!
তোমারও কি দেশে ফেরার ইচ্ছে?

 

আমি নীরব থাকি।
গুল্মলতার ঝাড় বুঝে নেয়- কবিরা
কোনো কোথাও যায় না,

তাদের প্রাণ তো এই সবুজে
তাদের গ্রাম তো

এই নিস্তব্ধতার ভিতর !


 

সবুজ

 

নিম গাছটা বিষণ্ণ আজ,

যেন তার জানালা ভেঙে

ওর ডালে বসে আছি ।

তিক্ত পাতার গন্ধে ভেসে আসে

দূর দেশ বহিরগাছির স্মৃতি—

মান্দারের লাল ফুল ঝরে গেলে

খড়ের উঠানে বসেছে যাত্রা গানের আসর

উঠানে উঠানে অস্টক গানে মেতেছে

কচিকাচার দল।

 

নিম-মধুর রোদে আমি ভাবি

ওর কাঠফাটা রোদে লুকিয়ে আছে

আরাবল্লির সমস্ত গ্রীষ্ম

নিম তো শুধু একটা গাছ নয়,

একটা অঙ্গীকারের নাম—

তিক্ততা সত্ত্বেও চিরতরুণ

চির সবুজ হযে থাকবার


 

শিখর

 

চিনার গাছটা এখানে বহিরাগত

আরাবল্লির পাথুরে জমিতে

ওর পাতা লাল হয় না ঠিকঠাক।

তবু হেমন্তে একটু-আধটু লালচে হয়ে

কাশ্মীরকে মনে পড়ায়

ওর ডালে ডালে জমে থাকে

অন্য পার্বত্যের ব্যথা

 

আমি দাঁড়িয়ে থাকি নিচে—

দেখি পিছনে হাইরাইজ শোহনা রোড

পাতার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়

উড়ে গেলো টিয়াদের ঝাঁক ।

 

একটা পাতা যেন

ডানায় ভর করে উড়ে গেলো

শিখরে পৌঁছানোর স্বপ্নমালা নিয়ে

 

 

 

জোনাকি

রাত নামলে জোনাকিরা জ্বালে
জঙ্গলময় অন্ধকারে এক আলোর মালা—

আকাশ দেখে চোখ নীচু করে

কথা বলে অরণ্যের সঙ্গে - দেখো,
এরা তো আসলে
হারিয়ে যাওয়া কবি !

আমি ভাবি  আমিও কি তবে একদিন…
ঝাটিবাবলা হাসে- হ্যাঁ, একদিন
তুমিও হবে একটি জোনাকি,

এই মঙ্গার হবে তোমার কবিতার খাতা
যে আলো দেবে অন্ধকারে হেঁটে যাওয়া
অন্য কোনো কবিকে!


 

 

শিকড়ের সন্ধানে

 

দিল্লি আমাকে দিয়েছে লোহার শিকড়—

ফ্ল্যাটের চাবি, মেট্রোর টোকেন,

আর অফিস যাওয়ার আট লেনের রাস্তা

দ্শ তলার হাইরাইজ ইনফিনিটি  টাওয়ার

আরাবল্লির অশ্বত্থ গাছ হেসে বলে,

অথচ আমার শিকড় দেখো

কর্দময় লাল ল্যাটেরাইট

যে যত উঁচুতে পৌঁছায়,

সে তত গভীরে অন্ধকারে নামে !"

আজ আমি খুঁজি

মাটির নিচের সেই সত্য,

যেখানে শিকড়গুলো

একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রাখে পৃথিবীকে ।

অমৃত

কঠিন খোলসের ভিতরে

মিষ্টি শাস লুকিয়ে রাখে যে,

সেই বেল গাছ দাঁড়িয়ে আছে

পাথুরে পথের ধারে

অনতিদূরে কুতুব মিনার ।

জীবনও তো এমনি হয - বলে সে,

বাইরে কাঁটার মিছিল,

আর ভিতরে হলুদ অমৃত।

পাকা ফল পড়ে মাটিতে

একটা ধ্বনি হয়,

গাছ থেকে আপেল পড়ে যাওয়ার থেকে

ভিন্ন

মহাজাগতিক কোন সূত্র ।

 


 

 

অর্জুন

অর্জুন গাছের নাম শুনেই মনে হয়

যেন মহাভারতের যোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে।

মসৃণ ধূসর বাকলে লেখা আছে

অসংখ্য যুদ্ধের ইতিহাস।

ওর পাতায় জমেছে বর্ষার জল,

যেন কর্ণের অশ্রু।

এই গাছ জানেন—

জীবন মানেই তো যুদ্ধ,

যুদ্ধ মানেই তো হেরে যাওয়া নয়,

লড়াই চালিয়ে যাওয়া

রুক্ষ বঞ্জর ভূমি থেকে

দেহময় সবুজে বেঁচে ওঠার নাম

দেহলিজ ।

 


 

 

 

ঘরের চাবি

 

বিদায় নেবার সময় মঙ্গার বলে-
ফিরে এসো

যখন শহর খুব ক্লান্ত করে দে!

আমি ভাবি, 

এই হল্লাবোলে

কে আমার দোসর

কোথায়  আমার বাড়ি ?

ফিসফিস করে ওঠে ফনীমনসা  মনে রেখো,

এই অন্ধকারই তোমার আত্মা

আর এই ্ভিরানাই তোমার বসতি
এই অরণ্যই
তোমার ঘরের প্রকৃত চাবি !


 

কালো জাম

 

জামুন গাছের নিচে দাঁড়ালেই

মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার কথা

হাতে-পায়ে নীল রং মেখে

ফল পাড়ার লড়াই

ফলের গাছ পাহারা দিতে দিতে

মধুমেহতে সারাজীবন ধুঁকে ধুঁকে

মরে গেলো জ্যাঠামশাই ।

 

খানে পাকা জাম পড়ে মাটিতে,

কিন্তু কে আর কুড়োয়?

জামুন গাছের নামে এই রাস্তার নাম

গাছটা যেন একা দাঁড়িয়ে থাকে,

যেন বলতে চায়—

স্মৃতি তো ফলের মতোই,

মিষ্টি কিন্তু কালো।


 

 

সময়

 

ব্যস্ততম  ট্রাফিকের তুঘলকাবাদ

শহরের শেষ বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে
যেখানে শুরু হয় মাটির পথ,

বাডকল পেরিয়ে জলকমলির বন
আমি খুঁজছি আমার ফেলে আসা দিন

খুঁজছি শৈশবের গন্ধ

ম্রপালি আমের মুকুল আর
বর্ষায় ভিজে ওঠা কাদার স্মৃতি

 

হঠাৎ টের পাই

পায়ের নিচে যাশোলা ভাট্টি কাঁটাতার

রৌদ্রতাপে পুড়ে যাওয়া অরণ্য বলে ওঠে -
ঘরে ফিরে যাও হে ব্যস্ত পথিক

এটা মাত্রা থেকে ছেঁটে অক্ষর

বাক্য থেকে মুছে ফেলা অব্যয়

এখানে সময়  মুল্যহীন  

এখানে সময়ের নিয়ম আলাদা

আলাদা!
 


 

 

 

সিগনাল

একটা শিমুল গাছের নিচে বসতেই
শুনি কণ্ঠস্বর-কেউ ডাকছে আমায়
অবশেষে এলি রে কবি!
আমি তোকে ডেকেছি বারবার
তোর লেখা কবিতার মাধ্যমে!

 

আমি চমকে উঠি- কে আমায় ডাকে
বনতুলসী হেসে বলে ওঠে  - ওই দেখ,
এখনই তোর আত্মার দোসর
তোর হাত ধরে টান দেবে
অজানার পথে!

আমি সেই মনময় মগ্ন মঙ্গার
যাকে তুই হারিয়ে ফেলেছিস
শহরের ট্রাফিক সিগনালে!


 

পিঁপড়ে

 

একটা পিঁপড়ের লাইন দেখিয়ে
আমায় গুলঞ্চ লতার সারি বলে -
এই দ্যাখ সত্যিকারের মেট্রো রুট!
যেখানে কোনো ভিড় নেই,
কোনো টিকিট নেই—
শুধু অসীম ধৈর্য!

 

আমি প্রশ্ন করি- এদের কি অফিস আছে,

আছে শিফট রান ? চাকরির সুরক্ষা 

রাত দেরী করে ঘরে ফেরা ক্যাব?

এদের বাড়ি কোথায়

এরা কোথায়ই বা যায় ?

 

মঙ্গারের নৈশব্দে আমি শুনিঃ

যেখানে তুই যেতে পারিস না—

নিজের ওজনের চেয়ে বড়

এক বোঝা নিয়েও ওরা ভ্রাম্যমান

প্রবাস নিয়ে ওদের কোন মনকষ্ট নেই
মাটির গভীরে নির্ভিক যাত্রা এদের
ওরা যায় বহুদূর

সময়ের গর্ভে !


 

 

পাখিদরবার

 

একটা দোয়েল ডাকে আম্রপালির ডালে—
আমাকে ক্রমশ ঘন হয়ে আসা

গুল্মলতার ঝাড় বলে-
শুনছিস? এটা তোর স্বর্গীয় পিতার সুর!
যেদিন তোর পিতা প্রথম দোতারা কিনে
তোকে শিখিয়েছিলেন
'আমার সোনার ময়না পাখি'!

 

আমার চোখ ভিজে আসে-
কিন্তু বাবা তো...

করোনার সময় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে

চলে গেছেন এই সাধের পৃথিবী ছেড়ে ।

 

সর্পগন্ধা ঝোপের মাঝে গুঞ্জরিত হয়- 

তোর বাবা মরে নি কখনো, এই দ্যাখ
তিনি গান করছেন এই পাখির কণ্ঠে!


 

 

 

বটবৃক্ষ

এক প্রাচীন বট আমাকে ডাকে
তার শিকড়ের আড়ালে—
এসো বাছা, দ্যাখো, শোনো এই
জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য!

আমি কান পেতে রাখি
তুমি যেমন আমার ছায়ায় বসে আছ,
ঠিক তেমনই একদিন
অন্য কেউ বসবে তোমার স্মৃতির ছায়ায়!
এটাই প্রকৃতির নিয়ম!

গুল্মলতার ঝাড়ে উকি মারে

মহাদেব শঙ্করের পুরানো মন্দির ।

 

বটবৃক্ষ সবসময় জানে
কীভাবে মৃত্যুকে জয় করে

অমর হওয়া যায় !


 

 

টিলা

আকা্শ অতিরিক্ত নীল নিয়ে 
দুবাহু ডানা ভাসিয়ে আরাবল্লি উড়ে যায়  

শিলার গায়ে লেগে থাকা ক্লান্ত রো

ধু ধু প্রান্তর ছুঁয়ে চলে গেছে তরাইন

কীভাবে একদিন আমীর খসরু
এই টিলায় বসে লিখেছিল
'মরুভূমির শেষ, সবুজের শুরু'!"

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে কবেই

মনে হয় জমে উঠেছে মেহফিল এতোদিন

কেউ যেন ডাকছে তাদের সান্ধ্য আসরে

গুল্মলতার ঝাড়ে বিকেল হলুদ হয়ে এলে

এখনো মনময় মঙ্গার রাঙা হয়ে ওঠে
এখানে প্রতিটি সূর্যাস্ত যেন
একটি করে লিখে যাওয়া অসমাপ্ত গজল!


 

 

স্মৃতিকথা


ভাঙা একটি প্রাচীন বেদীর ওপর
আঙুল বুলাই—
ঠিক যেন স্পর্শ করছি
তুঘলক আমলের কোনো নিঃশ্বাস!

এই পাথরেই
একদিন বসতেন

সুফি সাধক আউলিয়া নিজামউদ্দিন,
যারা শহরের কোলাহল ছেড়ে
খুঁজে বেড়াতেন নীরবতার অর্থ!

গুল্মলতায় ঘেরা মঙ্গার আমাকে

কানে কানে বলে -
আজ তুমি সেই চেয়ারখানি দখল করেছ,
কিন্তু প্রশ্ন তবু রয়ে গেছে—
দেখি তার,  জবাব দিতে পারো কিনা ।

 

আকাশ


সূর্য যখন নামে কাঁধে কাঁধে,
মেঘেরা মেলে দেয়
রক্তিম পালক-ঝালর—
আমার আরাবল্লি বলে-
দেখো, আজ মঙ্গার সবুজ পাঞ্জাবি পরেছে
তোমার বাবার মতো !

আমি চোখ বুজি—
হঠাৎ দেখি শৈশবের সেই নিকানো উঠান
যেখানে বাবা করতেন
ফকির লালনের  সুর-উতসব!


স্মৃতি এমনই এক স্রোত
পাহাড়ের ওপার থেকে ভেসে আসে
সন্তান হারানো বনমোরগের ডাক

পাহাড় খুঁজে ফেরে আর একটি পাহাড়

অরণ্য খুঁজে ফেরে

অরণ্যতর কোন এক সবুজ মঙ্গার । 


 

 

 

কাওয়ালি


সন্ধ্যার প্রথম তারকা উঠার আগেই
জোনাকিরা জ্বালায় তাদের প্রদীপ—
মঙ্গার তাদের মেজবানি করে  

এই পথিকেরাই হারিয়ে যাওয়া দরবেশ,
যারা সন্ধ্যায় এসে
লিখে যায় আলোর অক্ষর!

আমি প্রশ্ন করি-আমিও কি একদিন...
মঙ্গার বোধহয় আমার গোপন কথা জানে-
হ্যাঁ, একদিন তুমিও হবে একটি চলন্ত কবিতা
আমি লিখতে লিখতে দেখি—
আরাবল্লির পাদদেশ জুড়ে সন্ধ্যার প্রদীপ

মিট মিট করে জ্বলে উঠেছে

ঝিঝি পোকাদের একটানা আওয়াজে বেজে উঠেছে

বিষন্ন কাওয়ালির সুর ।


 

শিলা


পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠি
যেখানে শেষ হয় শহরের কোলাহল
আর শুরু হয় পাথরের গান—


একটা প্রাচীন শিলালিপি মতে,
এখানে বসে একদিন
মীরা বাঈ গেয়েছিলেন কৃষ্ণের নাম!

 

আমার দেহের মধ্যে মঙ্গার কেপে ওঠে-
মগ্ন হয়ে দেখো, এই শিলাতে
আজও আটকে আছে ভক্তির সুর!

প্রাচীন মন্দিরের গায়ে লেখা দেখি -
পাথর কখনো মরে না,

রোদ ঝড় বৃষ্টিতে
শুধু বদলে যায় তার যাপনের গল্প!


 

 

বাতাসে লেখা


আরাবাল্লি শিলাচূড়ায় দাঁড়াতেই
হঠাৎ খুলে যায় বাতাসের ডায়েরি—
মহাভারতের সমযে  এক সন্ন্যাসী
ই পাহাড়ে লিখে গিয়েছিলেন
'অহিংস পরম ধর্ম'!

আমি জিজ্ঞাস করি- কোথায় সেই লেখা

আমি তো খুঁজে পাচ্ছি না ।
মঙ্গার হাসে- মুছে গেছে সময়ের ভাঁজে,
কিন্তু শোনো—
এই বাতাসে এখনও
ঘুরে বেড়ায় তার কথা

পলকা হাওয়া নড়ে ওঠে চিরতা ঝোপ
ইতিহাস ধুলোয় মিশে যায়,
কিন্তু বাতাসে থেকে যায় তার অমর নিশ্বাস ।


 

 

আয়না

গুল্মলতার জঙ্গলে

একটা মসৃণ শিলাখণ্ডে
আমার প্রতিবিম্ব দেখে
মঙ্গার আমাকে বলে- চেনো একে
এই চেহারাই তো
হাজার বছর ধরে
খুঁজে বেড়াচ্ছে মানুষ  ।

ঝোপঝাড় নিঃশব্দে মুচকি হেসে ওঠে
পাথর হলো সবচেয়ে পুরনো আয়না,
যাতে দেখে নেয় পৃথিবী
বিলীন হয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের  মুখ !


 

 

 

ফেরা

 

আরাবল্লি পাহাড় থেকে
যখন নামতে শুরু করি,
টিলা বলে-  তোমার কিছু শ্বাস
এই শিলার ফাঁকে রেখে যাও
যাও, কিন্তু ফিরে এসো
যখন ভুলে যাবে , নিজেরই গল্প!

 

পিছন ফিরে দেখি—
আরাবল্লির কাঁধে হালকা অন্ধকারে
একটি তারা জ্বলে উঠেছে
ঠিক যেন আমারই
ভুলে যাওয়া কোনো পুরানো স্বপ্ন!


 

 

উড়ালের আগে


সবুজ টিয়ারা ডানা মেলে যখন সকালের রোদে,
আরাবল্লির টিলা থেকে দিল্লির ধোঁয়াশা তখন
লেপ্টে আসে বিষাক্ত নিশ্বাসে!

মঙ্গার কাঁপে- দেখো,
এরা তো উড়ছে না—এরা পালাচ্ছে!
শহরের বিষ থেকে স্বচ্ছ বাতাসের খোঁজে!

আমি ভাবি- কিন্তু কোথায় যাবে?

প্রান্তরে নেই ্সীমারেখা কিছু
সবুজ নামের যেটুকু দীপ আছে

সেটুকুই মঙ্গার

 

বাকিটুকু সবুজ যা কিছু আছে
তা শুধু
মানচিত্রের রঙিন ছবি মাত্র !


 

 

শব্দ যুদ্ধ


মেট্রোর লাইনের ওপর দিয়ে
যখন টিয়ারা উড়ে যায়,
একটা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন
কেটে দেয় তাদের কলকাকলিত গান!

আমি ভাবি টিয়ার কেন গায় না এখন?"
মঙ্গার উত্তর দেয়- কারণ
গানের চেয়ে জরুরি
শ্বাস নেওয়া!

 

ঝোপের প্রতিটা গুল্মলতাও যেন কবি

তারা আক্ষেপ করে বলে- 

আমরা তো শব্দ দুষণে
আবৃত্তি দূষণে

অক্ষর সহ, পংকতি সহ
মঞ্চে মঞ্চে মরে যাচ্ছি ক্রমশঃ

ধীরে ধীরে!


 

বিষের ভারসাম্য

একটা সবুজ টিয়া বসে আছে
নিম গাছের ডালে —

তার ঠোট ইষৎ বেগুনী

দূর আকাশে হাইরাইজ

হয়্ ফরিদাবাদ হবে , কিংবা গুড়গাঁও
আকাশ দখলের প্রতিযোগিতায়

নিম ফুটিয়েছে তার প্রতিরোধী ফুল!

ইষৎ আবেগতাড়িত মঙ্গার বলে

দেখো, এটাই তো নতুন দিল্লি—
যেখানে প্রকৃতি শিখছে
বেঁচে থাকার নতুন কৌশল!

মঙ্গার হাসে- আমরা তো
বিষাক্ততায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি,
যেমন অভ্যস্ত হয়
একটা ব্যাঙ
ধীরে ধীরে কুয়োর ফুটন্ত জলে!"


 

 

সব পাখি ঘরে ফেরে

 

তোমরা তো জানো বিকেল কতোটা প্রাসঙ্গিক

অথচ, আমি বহুদিন কোন বিকেল দেখিনি ।

অর্জনগড়ের রাডারের এন্টেনা পেরিয়ে
সন্ধ্যায় যখন টিয়ারা ফেরে

আরাবল্লির পাহাড় মঙ্গার অভিমুখে
তাদের পালকে লেগে থাকে আবহাওয়া
পিএম ২.৫ এর স্তর!

আমার ভাবি,  সন্ধে হলেই কেন

টিয়ারা  আরাবল্লি ফিরে চলে যায় ?

 
মঙ্গার নিশব্দে উত্তর দেয়- কারণ
এটাই তো তাদের শেষ  সবুজ দ্বীপ!

কেউ যেন আমাকে বলছে  একদিন
আমাদেরও হয়তো উড়ে যেতে হবে
কোনো অজানা টিলার অনুসন্ধানে!


 

 

ইতিহাসের পাতা

এই যে রাত

ঠিক অন্ধকারের মতো নয়

এই যে সকাল

ঠিক আলোর মতো নয়

দূর দিল্লি ঐ দিগন্তে বুঝি নিভে গেলো

ইতিহাসের শেষ টিয়াটি  বুঝি ডেকে উঠলো,
শুনতে পাই  মঙ্গারের  গোঙানি ,

ফিস ফিস করে টিয়াটি বলছে- শোনো,
এটা কোনো গান নয়—
এটা সতর্কবার্তা!

 

আমি কথাবলি আকন্দবনের ফুলের সঙ্গে

কানে কানে বলে সে - "লিখে রাখো,
এই টিয়াদের গল্প—
যারা একদিন , শুধুই ছবি হয়ে যাবে
ইতিহাস বইয়ের পাতায়!


 

 

লালবাত্তি

সবাই বাড়ি ফিরে গেছে

গাড়ির হেডলাইট জ্বলে
বৃষ্টিভেজা পিচ রাস্তায়
একটা সাইকেল পার করে গেলো
একাকী জাগতে থাকা লালবাত্তি

আমি ভাবি  - কেন
ফেরার পথ এতোটা নিঃসঙ্গ হয় ?

মঙ্গার চুপ হয়ে থাকে

চারিদিকে অগুন্তি ভেরেন্ডার গাছ

অযত্নে বেড়ে ওঠা জংলী বনজ

 

মানুষ ঘরে পৌঁছানোর আগেই
সবাই হারিয়ে ফেলে মানুষ !

আর রোজ খুঁজে ফেরে
অদৃশ্য একান্ত আপন কোনো বাড়ি!


 

সন্ধান

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে
পকেট খুঁজে ফেরে হারানো সময়—
আম্রকানন ,  বৈশাখে কুড়িয়ে আনা আমের গুটি ।

বহুদিন খুজে দেখিনি আমিও আলোকলতার শিকড়

 

আমাকে একাকী দেখ মঙ্গার বলেছে

দেখো, শিকড়ই শেষ কথা নয়-

একবার ঘর থেকে বের হয়ে

আজও কেউ ফিরে পায়নি
নিজের আপন আলয়!

 

বরং তুমি এই ছাতিম পাতায় লিখে রাখো,
এই বিপন্ন খোঁজের কাহিনী ।


এই জঙ্গলে প্রতিদিন
একটা করে মানুষ হারিয়ে যায়
নিজের সন্ধানে!


 

 

অচল ঘড়ির কাঁটা


আমার কোথাও যাবার নেই—
না কোনো গন্তব্য, না ফেরার ঠিকানা,
শুধু এই জানালার পাশে বসে

এক অরণ্য বিশ্বাস নিয়ে আমি ভাবি

স্তব্ধ ভিরানা কতো চঞ্চল

বালি কাটা পাহাড়ের শরীর বেয়ে...

দেখি কীভাবে রোদ সরে যায়

কিছুই থেমে নেই

এই ঘাসপাতা ,   কারিপাতার জঙ্গল

মহানিমের শাখা আমায় বলে- দেখো,
সময় থেমে গেলে
একাকিত্বই হয়ে ওঠে একমাত্র সঙ্গী!

শহরের প্রান্তে মঙ্গার একা এক বিশ্বাস

স্থিরতা নাকি মৃত্যু একাকী
তারও কোথাও যাবার নেই আজ ।


 

 

চায়ের কাপ


টেবিলের উপর একা
ঠাণ্ডা হয়ে আসে চায়ের কাপ—
তার ভাঙা প্রান্তে আটকে আছে
অনেক অকথিত কথা ও কাহিনী...

আমি প্রশ্ন করি- কেন
আলোড়ন হয় না আর
এই নিস্তরঙ্গ তরলে?


মঙ্গার নিজেই শিখেছে হাটা চলা

সেই জানে এই প্রশ্নের উত্তর
অনেকক্ষণ একা থাকলে
জলও শিখে যায়
নিশ্চল থাকার কৌশল!


 

পাহাড়


সন্ধ্যা নামলে

আরাবল্লির পাহাড়ে লেগে থাকে
আমারই অস্পষ্ট ছায়া—
আর একটি দ্বিতীয় পীযূষ
যারও কোথাও যাওয়া নেই...

গুল্মলতার ঝাড় ফিসফাস করে- 

একাকিত্ব একদিন রূপ নেয়
আর একটি দ্বিতীয় পাহাড়

যে কথা বলে না
কিন্তু সব শোনে!


 

রাতের ট্রেনের শব্দ


দূর রেললাইনে কেঁপে ওঠে
একটা নিশাচর ট্রেন—
এটাই তো একাকিত্বের আসল ভাষা-
কোনো গন্তব্য ছাড়াই
শুধু চলেই যাওয়া !

আমি জিজ্ঞাস করি- কিন্তু কেন
আমি যেতে পারি না?
মাটিতে আটকে থাকা দারুহরিদ্রার গাছ

নীরব চলন তার ব্যাপ্তি আকাশ

ম্রিয়মান গাছ বড় একাকী
যারা সবচেয়ে বেশি একা
তারাই তো আসলে পায়

উন্মুক্ত মঙ্গার ।


 

 

ভোরের অপেক্ষা


রাত যত গভীর হয়
ততই বোঝা যায়—
নৈশব্দ কোনো শূন্যতা নয়,
এক বিশাল পূর্ণতার নাম...

মঙ্গার কানে কানে বলে- যখন
কোথাও যাওয়ার থাকে না,
তখন সব পথই
তোমার ভিতর দিয়ে যায়!

গুলঞ্চলতার ঝোপে কেউ গুঞ্জন করে

যে বন যতো নিঝুম
সেই বন সবচেয়ে বেশি
সম্পূর্ণ!


 

 

 

পাখির প্রশ্ন

একটা দোয়েল এসে বসে
আমার কাঁধের ওপর—
জিজ্ঞাসা করে- কেন
তোমার চোখে এত নিস্তব্ধতা?

আমি উত্তর দিই- আমার
কিছু বলার নেই...
পাখিটি বলে- 

তাহলে তো ভালো!
যারা  কথা বলে না
তারাই তো দেখতে পেয়েছে
মনময় দৃশ্যমান এই মঙ্গার ।


 

 

নিশীথের ডাক

 

মগ্ন আমি, মগ্ন অন্ধকারে,
নক্ষত্রের রেশ ধরে আসে কে?
আমার ভিতর এক যে অরণ্য বসে আছে,
যে একা একা এই ভিরানায়,

কথা বলতে চায় 

একটি ছাতিম ছায়াকে জিজ্ঞাসা করি

কে তুমি?
উত্তর দেয় না, সে শুধু হাসে
আমারই মুখ, আমারই চোখ,
তবু অন্য কেউ,

মনময় মঙ্গারের গভীর পিপাসায়।


 

 

মঙ্গারের ছায়াসঙ্গী

 

আমি সেই ক্ষত, যা তুমি লুকাও,
আমি সেই স্বপ্ন, যা ভেঙে যাও
তোমারই গল্প, তোমারই গান,
উজাগর তামাম ফরিদাবাদ দেহে

তবু কেন এই বালি চুরি ক্ষত ?

 

ঝড়ের ভাষায় কেউ যেন বললো
থামো! একবার থামো তো

আমাকে থামিয়ে দিয়েছে আমলকি বন ।

 
ইতিহাস পাতা আমার ভুল,

ভৌগোলিক রেখা আমার পাপ,
আমারই অক্ষর স্মৃতি রয়ে যায়

ভেঙ্গে যাওয়া খন্ডহরে  ।


 

আরাবল্লি রিজ     

 

পথ হারালাম আজ সন্ধ্যাবেলা,
মেঘের গায়ে লিখে দিলাম

কৃষ্ণচুড়ার নাম


মঙ্গার ডেকে চলে যায়,

চলো, এই বনপথ ধরে অনন্ত হাটি ,
অজানার ঘ্রাণে ভরে দিই

হেমন্তে বন্ধ্যা হযে আসা খাদারের মাটি ।

 

 

কালো জোড়া ফিঙের কাকলীতে

ভরে দিই শিয়াকুল কেরি ফলের স্বাদ

সবুজে ভরাট করি

ক্রমশ উজাড় হয়ে আসা লাল বালির ফরিদাবাদ ।

 

পায়ের তলায় কাঁটার বিছানা,
তবুও যেন—এ তো নতুন, কতো চেনা!
যাত্রা আমার কেন যে অনন্ত নয ,

দিন ফুরাবার আগে চলো বুনে রেখে যাই

জাতিস্মর ঝাঁটিবাবলার বীজ
আষাড়ের মেঘের গায়ে লিখে দিয়ে

লাল নীল গোধুলির আরাবল্লি রিজ ।


 

 

ছায়া

 

আমার ছায়া বলে, তুমি কে?
আমি বলি, আমি তো তোমারই প্রতিবিম্ব।
ছায়া হাসে, মিথ্যে কথা!
আমিই আসল, তুমি তো শুধুই ছদ্মবেশী!

বিকেলে ঝরে পড়া বহেরার শুকনো পাতা

সুলতানী আমলের খোদায় করা বাউড়ি

ইতিহাস কি তবে শুকিয়ে আসা নদী
নাকি জমি থেকে উঠে আসা জল

স্নানঘরে বদলে গেছে আয়না সকল

রোদ্দুরে ঝগড়া, অন্ধকারে সন্ধি,
নিজেরাই করে চলি নিজেদের

ছাযার সন্ধান।


 

লবন

 

লবণের গন্ধে জড়িয়ে আছি,

মঙ্গার যেন এল হরিদ্রাভ সমুদ্র
ডুব দাও, বলে সে

অথৈ জঙ্গলে,
ঘন সবুজে কখন জানি ডুবে গেছিলাম !

 

আজ ব্যস্ত সড়কে যানজট

পি পি হর্ণের শব্দে ঘুম ভেঙ্গেছে যখন

লোকালয়ে দাঁড়িয়ে ভাবি—

আর কত দূর যাব?
মঙ্গার আমার কাধে হাতে রেখে বলে

তুমি তো একটি বৃক্ষ
ফিরে এসো এই অরণ্যে আমার

এই গর্ভে লুকিয়ে থাকো,
যেখানে শান্তি,

যেখানে পাবে সব প্রশ্নের উত্তর


 

 

মৃত্তিকা

 

মাটি বলে, তুমি আমারই সন্তান,
কেন এত অহংকার?  

আমি লজ্জায় মাথা নিচু করি,
ক্ষমা করো মা, আমি ভুলে গিয়েছিলাম—
তুমিই আমার প্রথম ও শেষ ঠিকানা।

মাটির গন্ধে ভরে উঠে প্রাণ,
ঝাটি বাবলার বনে মঙ্গার হেসে ওঠে,

এবার বুঝলে তো?
মৃত্যু নেই, শুধু আছে ফিরে যাওয়া,
এক ফোঁটা জল হয়ে মিশে যাওয়া।


 

 

গর্ভচাপা 


শুনো,

বলে হেমন্তে ফুটে ওঠা রোহিদা ফুল,
তুমিও একদিন ধুলোয় মিশে যাবে
যত রাজত্ব, যত হুংকার—

চার পংকতি দেবনাগরী
সবই তো জঙ্গলের টুকরা খন্ডহর  ।

মেহরলি পার করে কখন যে

পৃথ্বিরাজের  লালকুয়া বুজে গেছে ।

 

কেপে ওঠে লাল পাথর শাহজানাবাদ ,
আমরা শুধু ক্ষণিকের পথিক—

এই মঙ্গার সাক্ষী,

সাক্ষী এই বসন্তের গুল্মলতার ঝাড়
এই জঙ্গলই সাক্ষী সুলতানাতের  ।


 

 

সন্ধ্যামিলন


ময়ূরের পালক ঝরে বাগানে,

ছড়িয়ে আছে ন্ুড়ি পাথরের চাঁই
মঙ্গার বলে,

দেখো, কবিতা শব্দ করে পড়ার নয়

বসন্তের পাতায় পাতায় চিকচিক করে 
কোনো কবির অব্যক্ত কথা

এই সরকারী সাহিত্য  মঞ্চে ডাক পেলাম না

কবিতা পড়ার ।

 

আমি হাত বাড়াই মঙ্গারের গায়ে—
রেখে যা আমা এক টুকরো ছায়া,

হয়তো শহর ভুলে যাবে সাহিত্য মঞ্চের  নাম
হয়তো দিল্লি ভুলে যাবে সুলতানের নাম,
আমার কবিতা পড়বে মঙ্গারের

এই পাথরেরা

আর এই ্ভিরানার ময়ূর ।

 


 

সাদা কাপড়

 

রাজকন্যার সিঁদুর মুছে গেছে আয়নায়,
কিন্তু লাল রেশ রয়ে গেছে

আমার রক্তে...

তার  শ্যাওলা জমা সমাধীতে যখন
অরণ্যের নামে জল ঢালি,
মনে হয় যেন

ঈশ্বর ধুয়ে দেন আমার সব পাপ!

 

রায়পিথোরার একটা মেয়ে ছিল,

বৃষ্টির মতো কিশোরী
যে হারিয়ে গেছিলো বনের মাটিতে—

মঙ্গার তার বেঁচে ওঠা কন্যা,
একটি জীবন্ত কবিতা,

আর

আমি তার অরণ্য প্রেমিক ।

 


 

বিদায়

 

আমি উঠে দাঁড়াই,
সর্পগান্ধার ঝোপ বলে,

যাস নি এখনো—

স্বপ্নপুরীর গল্প বাকি এখনো 

আছে ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীদের কাহিনী।

 

এই বুগেনভালিয়া আমার ফুল নয

এই কেরি ফলের গাছ নয আমার

দূরবাংলায় ফেলে আসা শৈশব ।

 

আমি তো খুঁজি পুকুর পাড়ে দাঁড়ানো জামরুল

ভোরের উঠান ফোটা বেলফুলের গাছ

এই শহরে আমার মায়ের গন্ধ নাই

যতই না আমি ফিরে যেতে চাই দূর বাংলায়

থানকুনি ঘাসের পাতা আমার পা চেপে ধরে

পা ফেলি ধীরে,
পিছনে শুনি—
যেখানে যাবি, আমরা আছি,

মায়েরা থাকে এখানেই
ঝোপের মতন,

কাঁটার মতন,

নীরব!


 

 

চিঠি

 

মা, আজও তোমার হাতের

স্বল্প তেলে পুঁটি মাছ ভাজার কথা মনে পড়ে—
পিজ্জা বার্গার নান রুটিতে
যেন আর কোনো স্বাদ নেই...


অফিস চত্বরে বসে তোমায় চিঠি লিখি,
কিন্তু ঠিকানা কী দেব?
তুমি তো দূর দেশে ফেলে আসা স্মৃতি!

 

শহর তো নয়, এ এক কাচের জঙ্গলে

সারাদিন অফিস মিটিং ক্রেতা বিক্রেতা
এই ভীড়ের এক ঘেয়ে শপিং মল

মাঝে মধ্যে মনে হয় ছেড়ে চলে যাই দূর

উমাদের পুকুর পাড়ে হিজলে ডালে

বুলবুলির ডাক শুনি...

 

উফ, ফের মিটিং মিটিং মিটিং

অফিস শেষে  লিফটে দাঁড়িয়ে
আকাশপৃষ্ঠে একটু অবকাশ খুঁজি,

দেখি ব্যালকনিতে
মা-হারা এক শালিক পাখি বাচ্চা ।


 

 

দৌড়  

 

কে আগে যাবে

সবুজ ঘিটোর্নী পার করে

এই মেট্রো যাবে হুডা সিটি সেন্টার

গন্তব্য একই অথচ তাড়া আলাদা

মেট্রো স্টেশনের কিসের যে এতো দৌড় ।

 

ইংরেজি সংলাপের ফাঁকে
হঠাৎ কানে এলো চাপা এক বাংলা গালি—
সেদিকে তাকাতেই এক প্রবাসী মুখ

চোখ নামিয়ে নিল...
আমরা দুজনাই জানি
এখানে আবেগ দেখানো
মেট্রোর টিকিটের চেয়েও দামি!


 

 পাখি 

একটা বুলবুল ডাকে ছাতিমের শাখায়,
আমাকে মঙ্গার জিজ্ঞেস করে—
এই পাখিটার গান কি একই রকম
যখন সে উড়ে যায় দূর বাংলায়

হেসে ওঠে দোয়েল ফিঙে 

প্রবাসী পাখি তো,

গান বদলে ফেলে ঠিক যেমন
তুমি কামড় দিয়ে খাও তন্দুরী রুটি

রমণ করার আগে

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে

যেমন বদলে ফেলো নিজের মুখ !

 

কবিতা 

 

চাঁদ উঠেছে এই অরণ্যের

সব চেয়ে উচ্চ এই খেজুরের গাছে,
মঙ্গার বলে—দেখো,
এই আলোই একদিন ছুঁয়েছিল
হুমায়ুনের সমাধির চূড়া

আমি ভাবি কবি হওয়ার অর্থ কি
শুধুই স্মৃতির ফেরিওয়ালা হওয়া

নাকি উত্তরণ

উচ্চে ওঠাই তার একমাত্র ঠিকানা  ।


গুলঞ্চ লতার ঝোপ উত্তর দেয়— 

না, তা নয়
একটা নিজস্ব দেশকে নিজের ভিতর
জীবন্ত রাখার নামই কবিতা!


 

প্রবাসী 

আমার ভিতরে লুকিয়ে আছে
সাতটি সাগরের নুন,
তেরটি নদীর জল

আর তোমার ভিতরে কি আছে

তোমার কয়টি সীমানা?

 

মঙ্গার জানে তার ভৌগোলিকতা

সীমিত জবাবে সে বলে--

একটা,
কিন্তু সেটা ভাগ হয়ে গেছে
মেট্রোর লাইনের মতো—
ম্যজেন্টা, ইয়োলো, ব্লু, পার্পল...
আর পার্কে একলা বসার

এই বেঞ্চটায়!


 

 

পাথর  

এই পাথরগুলো কি জানে
আমার বাবা-মায়ের নাম?
মঙ্গার কানে কানে বলে,
ওরা শুধু জানে সিকান্দার লোধিকে

ঝোপেরা ছায়া লিখে যায় মাটিতে—
ইতিহাস সবাইকে পাথর বানায়,
তুমিও একদিন পাথর হয়ে যাবে
বসন্তকুঞ্জের ভেঙ্গে আসা পাথরে

আমি তাই দেখি পূর্বপুরুষের মুখ

ঝোপের ফাঁকে আজ চাঁদ উঠেছে,
টুকরো টুকরো—

যেন ভাঙা আয়না!


 

মেট্রোর জানালা 

 

ইয়োলো লাইনে বসে দেখি
অরণ্য দৌড়ে যায় উল্টো দিকে!
মঙ্গার বলে - দেখো,
তোমার জীবনও তো এমন—
সবকিছু ছুটে যাচ্ছে,
কেবল তুমি বসে আছ
একটা সিটে আটকে স্থির অটল ।

 

এই অক্ষরমালা ছুটে যাচ্ছে দিকবিদিক

সবুজ ঘন হয়ে আসে তার দিকবলয় ।

 

গুল্মলতার ঝাড় আর আমি

একে অপরের অপেক্ষায়

যাত্রাপথের শেষ স্টেশনে

যে যার প্ল্যাটফর্মে বসে থাকি ।


 

 

ঝরাপাতার গল্প 

 

এই যে পিপল গাছের পাতা
মাটিতে পড়ে আছে—
এটা কি দূর বাংলাভূমি থেকে

উড়ে এসেছে?
মঙ্গার আমাকে জানায় - না,
এটা তো দিল্লিরই পাতা,
কিন্তু এর শিরা-উপশিরায়
লেগে আছে তোমার
গ্রামের বাড়ির উঠোনের ধুলো!

নীলকান্ত পাখি ডেকে ওঠে
পাতারা মরে যায় বটে,
কিন্তু যারা কবিতা লিখতে জানে,
তাদের জন্য প্রতিটি ঝরা পাতা
একটি নতুন দেশ!


 

 

 জাহানপানাহ 

 

কাচের গম্বুজ ভেদ করে
একটা কাক ঢুকে পড়ে প্রাসাদে
মঙ্গার হেসে ওঠে - দেখো,
যে সিংহাসন ছিলো ময়ূরপঙ্খীর

সেখানে বসে আজ কালো ডানার এক পাখি

মর্মর পাথরের খোদাই কাজে যেখানে

জ্বলজ্বল করতো মানিক্য
পায়রারা সেখানে বাসা বেঁধেছে আজ ।

মঙ্গার সে কথা জানে

আর জানে বলেই উচ্চারণ করে--

এখানে একদিন
ফারসি কবিতা পাঠ হতো

কাফি গেয়ে উঠতো বুল্লে শাহ

তান সেনের কণ্ঠে বেজে উঠতো অরণ্য
আজ শুধু শুনি চিল আর

শকুনের ডানার শব্দ!


 

কুহনারার রাত

 

চাঁদ উঠেছে গোলাকার বুরুজে,
মঙ্গার বলে ওঠে , 

এই চাঁদ দেখেছে
মুহাম্মদ বিন তুঘলকের
দিল্লি ছাড়ার কষ্ট!

আমি বলিকিন্তু আমি তো
দিল্লি ছাড়তে পারি না!
এই গুল্মলতার জঙ্গল হাসে-- 

তোমার মতো
মস্ত প্রবাসীই জেনো এক মোহাম্মদ বিন তুঘলক

যারা নিজের সাম্রাজ্য গড়ে
আবার নিজেই তা

ভেঙে গুড়িয়ে দেয়!


 

 

 ইতিহাস 

ফোর্টের গেটে দাঁড়িয়ে বলি—
বিদায়, হে ধ্বংসস্তূপ!
মঙ্গার জবাব দেয়

এখনি না,
তুমি চলে গেলেও
তোমার ছায়া থেকে যাবে
এই ইটের গায়ে লেগে—
যেমন লেগে আছে
সাতশো বছরের সমস্ত অশ্রু!

গুল্মলতার ঝাড় বলে —
ইতিহাসের মর্ম বুঝতে
একজন কবিই যথেষ্ট,
যে নিজের বুকের রক্ত দিয়ে
লিখে যায় নতুন ইতিহাস!


 

 লাল

টিয়া পাখি বসেছে গম্বুজের খোদাইয়ে—
সালাম, হে কবি!

তুমি তো অভিজাত মানুষের কবি

বলে সে ফারসি কবিতার সুরে সুরে ।

 

এই প্রাসাদে

আমি দেখেছি অনেক রাজ উতসব
সাত সুলতানের উত্থান-পতন,
ঝোপের ধারে কাঁদতে থাকা
কোন পথচারী ক্ষুদার্তদের দিকে

কিন্তু কেউ ফিরে তাকায়নি

 

মঙ্গার আমাকে বলে

টিয়া মিথ্যে বলে না,
ওর রঙিন ঠোটে লেখা আছে
ইতিহাসের রক্ত  লাল


 

 

হাতে খড়ি

 

সন্ধ্যা নামলে সবুজ টিয়ারা হয়ে যায়
নীলচে পাথরের মতো—
অফিস ফেরত নাগরিকেরা বাড়ি গেলে

আরাবল্লির চুড়ায় চাদ উঠে বলে

এখনই সময়

চলো আমরা গেয়ে উঠি
প্রবাসের বিষণ্ণ গান !

লাল ঠোটে টিয়া উত্তর দেয়

গান? আজ থাক
বরং রোমান্থণ করি  স্মৃতি কথা
দূর বাংলায় তোমাদের বাড়ির
পুকুর পাড়ে ঝুঁকে পড়া বরই গাছটার কথা

সরস্বতী পুজোয় নতুন স্লেট পেনসিলে

হাতে খড়ি দেওয়ার কথা ।

আসলে টিয়ার স্মৃতি
মানুষের চেয়েও খুব স্থায়ী,
কারণ ওরা ভুলে যায় না
প্রথম বুলি শেখা ভাষার স্বাদ!"


 

 হাম্মাম

 

বাউলি এসেছে ঘুঙুর বেঁধে,
খালি হাতে—জলের ঘড়া নেই!
শাহী স্নানঘরের ফোয়ারা শুকিয়ে,
মর্মর পাথর ফাটল ধরে কাঁদে—

এখানে একদিন
গোলাপজল ছিটাতো দাসীরা,
আজ তুমি দাঁড়িয়েছ
ধুলোমাখা পায়ে,
হাত বাড়াও শুধু
অদৃশ্য জলের স্বপ্নে!


 

 

জলকলস

বাউলির কোমরে বাঁধা অদৃশ্য ঘড়া,
আঙ্গুলে স্পর্শ করে আছে শুকনো ঝরনা—
ঙ্গার, তুমি কি শুনতে পাও
সুলতান কন্যার স্নানের গান?
যে গানে মিশে ছিল
জাফরান আর কেশরের স্বাদ!

ধ্বংসস্তূপ থেকে উত্তর আসে—
তুমিই তো সেই জল,
যাকে খুঁজে বেড়ায়
সাতশো বছরের পিপাসা!


 

 

শিরীষ

আমি মঙ্গারের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা শিরীষ,
যার ফুলে ফুলে জমেছে ধুলোর রাজধানীর গল্প—
রোজ ভোরে যখন মেট্রোর শিস ভেসে আসে,
আমার ডালপালা কাঁপে শহুরে বিষের স্পর্শে।

 

গাছ কি কাঁদতে জানে?


জিজ্ঞাস করেছিল আমায়

ঠেলায় করে বেচতে আসা এক হকার
যে আমার ছায়ায় ঘুমোত রোজ দুপুরে...

 

আমি তাকে দেখিনি বহুদিন
আজ তার জায়গায় জমে উঠেছে
একরাশ পলিথিনের স্তূপ।


 

 

 

 

 

স্বপ্ন

 

আমি এই সুপ্রাচীন বট
যার শিকড়ে জড়িয়ে আছে মঙ্গার
এক শহরের ইতিহাস—
কখনো মসজিদের চাতালে,
কখনো পালি গ্রামের চৌরাহাতে ।

 

আমার ছায়ায় বসত
এক পাগলী মা
এক চৈত্রের রাতে

যে হারিয়েছিল তার শিশুক। ।
প্রতিদিন সে আমাকে জিজ্ঞাস করত:
গাছেরা কি স্বপ্ন দেখে?

 

আজ রাতে কি যে হলো

আমি ঠিক যেন স্বপ্ন দেখলাম
আমার পাতার শব্দে
শোনা যায় একটি মায়ের
অনন্ত হাহাকার...

 


 

 

ছায়াবাজী

দুপুরের রোদে পড়ে আছে
প্রাসাদের শেষ ছায়াটি—
মঙ্গার বলে- দ্রুত ছবি তুলে নাও,
এই ছায়াই তো শেষ সাক্ষী
সেই সব রাজকীয় উৎসবের!

আমি বলি- কিন্তু ছায়াতো
আমার ফোনে ধরা পড়বে না!"
গুল্মলতার ঝাড় ফিসফিস করে বলে- 

তাই তো,
কবিতাই একমাত্র ক্যামেরা
যা ধরে রাখতে পারে
অদৃশ্য ছায়াদের!


 

সোনার মুদ্রা

এখানে একদিন
তুঘলক আগুনে গলিয়েছিল সোনার সিংহাসন,
এই প্রান্তরে রাজকোষ শূন্য করে

স্বর্ণ গলিয়ে তৈরি করেছিল তামার মুদ্রা—

আমি জিজ্ঞাসা করি- কিন্তু কেন?
গুল্মলতার ঝাড় হাসে - মূর্খ কবি!

সুলতান সুলতান আর মানুষ মানুষ
মানুষকেই তো গলিয়ে তৈরি করা হয় স্বর্ণমুদ্রা  !

 

বিকেলের রোদে জ্বলজ্বল করে মঙ্গার,
মনে হয় যেন উজাড় করে দেওয়া

সিন্দুকের শেষ মুদ্রা!


 

 

বৃষ্টির রাত

আজ ভাঙা গম্বুজের ফাঁক দিয়ে
দেখা যায় কালো মেঘের যুদ্ধ!
 মঙ্গার বলে- এমনি এক রাতে
দিল্লির শেষ বেগম কেঁদেছিল
এই হাম্মাম খানায়!

গুল্মলতার ঝাড় কানে কানে বলে- 

জল আসছে,
কিন্তু এই পাথর আর তৃষ্ণা মেটাবে না,
কারণ প্রাসাদের পিপাসা
শুধু রাজরক্তেই মেটে!


 

প্রেমিকের দাগ

নুড়িপাথর কুড়িয়ে  

ভাঙা ফোর্টের গায়ে আর একবার হাত বুলাই—
দক্ষিণ দিকের স্তম্ভে খোদাই করা
রাজু + রেশমা

কে এই দুজন?

চোখ পালটিয়ে মঙ্গার আমাকে বলে 

ইতিহাস ভুলে যায় রাজাদের,
কিন্তু মনে রাখে সাচ্চা প্রেমিকদের!


 

আঙিনা

এই প্রান্তরে কখনো শিবির লাগতো

এইখানে ছিলো খাস জনের আবাস

এই কোণায় একদিন দাঁড়িয়েছিল ইবনে বতুতা,

লিখেছিল- দিল্লির বাতাসে মিশে আছে স্বর্ণগন্ধ! 

 

মধ্যরাতে যখন জোনাকি জ্বলে

ভাঙা প্রাসাদের আঙিনায়—

মনে হয় যেন জ্বলছে

সহস্র মুদ্রার আসরফি !

 

আমি দিল্লির মাটি আঁচড়ে দেখি

এই ধূলির নিচে চাপা পড়ে আছে

অসংখ্য সৈনিকের হাড়!

সূর্যাস্ত রাঙা হয়ে আসে—

 

এইখানে ছিলো মজলিস

রক্তে রাঙা সেই সন্ধ্যায় দেখি সেই ধ্বংসাবশেষ

সুলতান বোধহয় এখনো জাগ্রত আছেন 

জাহানপানাহের শয়ন কক্ষে ঢুকতেই

একদল পায়রা উড়ে যায়—

 

হাম্মামখানা

ভোরের কুয়াশায় যখন তুঘলকাবাদ
আস্তে আস্তে তার জীর্ণ চাদর খুলে দেয়,
আমি দাঁড়িয়ে থাকি ডান দিকে

দক্ষিণ গেটের ভাঙা খিলানের নিচে—
যেখানে আমি একদিন সুলতান ছিলাম
দশ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রায় বানানো এই তো শয়ন কক্ষ

এই তো বেলজিয়াম কাচে স্নানঘর

আজ এই চব্বিশ কিলোমিটার দূর্গে

আমি যেন এক অশরীরী  

আমার ছায়াকে চিনতে না পেরে

শুধু এক পাগলা কুকুর কেন যে
ঘেউ ঘেউ করে

 

হাম্মামখানার গায়ে হেলান দিয়ে
আমাকে তুঘলকাবাদ জিজ্ঞাস করে-
তুমি কি শুনতে পাচ্ছ
এই নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া
সেই সব চোদ্দ হাজার দাসীদের খিল খিল হাসি?
তুমি তো কখনো জানতেই পারেনি
তোমার স্নানের জল আসে কোথা থেকে?"

আমি উত্তর দিই- না,

আমি শুধু শুনি

আর ধীর পায়ে এগিয়ে যাই

শতাব্দী পুরানো বাউড়িকে

বাম হাতে রেখে ।


 

ঈশ্বর

আমি কদম্ব
যার ফুলে ফুলে লেখা আছে
সহজ সাধনা-র গান—
মালা ফেরাই না, মন ফেরাই
আমার ডালে ডালে
বসে আছে সেই সত্য

 

বৃক্ষ কি খোঁজে ঈশ্বর?
প্রশ্ন করেছিল এক ফকির
আমি হাসলাম

এই নতুন বছরের প্রথম বর্ষায়

ফুল ফুটিয়ে দিলাম ।


 

 

নমাজ

নমাজের ওয়াক্ত হলো, আই খাদিম!
আজান দিল সেই আফ্রিকি গোলাম
যার কণ্ঠে বাজে ইলতুতমিশের
সময়ের ঘণ্টাধ্বনি

মসজিদ কি ভুলে যায় নামাজি?
জিজ্ঞাস করেছিল এক ফকির
যখন মিহরাবে জমা হলো
শত বছরের ধুলো...


 

 

গজল

 

খামোশ, সাহেবজাদা!
সতর্ক করে দিল রাজদরবারের নাপিত
যখন সূর্য ডুবল
হাওজ-ই-শামসির জলে—
যেখানে প্রতিবিম্ব দেখে
ফিরোজ শাহ তুঘলক
গুনতেন হারানো সাম্রাজ্যের হিসাব

ইতিহাস কি ঘুমায়?
কবি আমির খসরু লিখে গেলেন
তার শেষ গজলে...

 

কুতুবের স্তব্ধতা

লোহার স্তম্ভের গায়ে
জমে আছে সাত শতাব্দীর মৌনতা—
যেখানে আলাউদ্দিনের কবিরা
লিখে গেছেন শেখ সাদীর গজল
জাফরান-রঙা কালিতে

এখন শুধু বাতাসে ভাসে
মসজিদের ধুলোয় মিশে যাওয়া
এক দরবেশের প্রশ্ন
গাছের ব্যথার মাপজোখ


 

বেগম

 

মর্মর পাথরের গায়ে
ফিরে ফিরে আসে গোলাপজলের ঘ্রাণ
আর লোদি বেগমের
অশ্রুর স্ফটিক-কণা

প্রতিটি খিলানের নিচে
জমে থাকে স্নানরত রাজকন্যাদের
চুলের পাকার গল্প
যা কেউ শোনেনি কখনো


 

 

মসজিদের ধুলিকণা

জামা মসজিদের মিহরাবে
আটকে আছে ইলতুতমিশের সময়
যখন আফ্রিকি গোলামের আজান
মিশে যেত সন্ধ্যার লালিমায়

এখন শুধু জমা হয়
ফকিরদের পদধূলি
আর শতাব্দীর পর শতাব্দী
নামাজের অপেক্ষায় থাকা
একটি মৃত পায়ের ছাপ