অজিত জী
আলাপচারিতায়
অজিত কৌর
সার্ক কান্ট্রির
সাহিত্যিকদের আম্মা, পাঞ্জাবী লেখক শ্রদ্ধেয় অজিত কৌরের সঙ্গে আলাপচারিতায় পীযূষকান্তি বিশ্বাস
[ আজ আমরা এসে
পৌঁছেছি, একাডেমী অব ফাইন আর্টস এন্ড কালচার, সিরিফোর্ট, নিউ দিল্লি । প্রখ্যাত পাঞ্জাবী
ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ,
সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং সমাজ ও পরিবেশকর্মী অজিত কৌর যাকে সাহিত্য আকাদেমি তার সর্বোচ্চ
সম্মান – ফেলোশিপ – প্রদান করেছে ২০২৪ সালে। ১৯৩৪ সালের ১৬ নভেম্বর তৎকালীন
ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে সর্দার মাখন সিং-এর পরিবারে তাঁর জন্ম। দেশভাগের পর ১৯৪৭
সালে তাঁর পরিবার দিল্লিতে চলে আসে, যেখানে তিনি ১৯৫২ সালে
অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ
করেন। সত্তর বছরেরও অধিক সময় ধরে তিনি পাঞ্জাবী ভাষায় কথাসাহিত্য রচনা করছেন। তাঁর
আত্মজীবনী ‘খানাবাদোশ’ (১৯৮৬ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত) তাঁর গভীরতম
আবেগ ও অভিজ্ঞতার এক মর্মস্পর্শী দলিল। তাঁর কন্যা, প্রখ্যাত
চিত্রশিল্পী অর্পণা কৌর, বর্তমানে তাঁর লেখার অন্যতম
প্রেরণা। সাহিত্য রচনার পাশাপাশি অজিত কৌর একজন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংগঠক।
তিনি ১৯৮৭ সালে সার্ক রাইটার্স অ্যান্ড লিটারেচার ফাউন্ডেশন (FOSWAL)-এর প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি হিসেবে সার্ক অঞ্চলে প্রথম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক
উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সাহিত্য ও সমাজসেবায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি
পদ্মশ্রী (২০০৬), সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার সহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত
হয়েছেন। অজিত কৌরের দীর্ঘ ও বর্ণময় কর্মজীবন তাঁকে ভারতীয় সাহিত্যে এক অনন্য স্থান
দিয়েছে। আজ তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমরা খুবই আগ্রহী। আমার সাথে রয়েছেন দিল্লিরই
একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি, প্রাণজি বসাক যিনি এই সাক্ষাৎকার
পর্বে আমাকে সহায়তা করছেন।]
সৎ শ্রী অকাল, আম্মা অজিত জী । আমার নাম পীযূষকান্তি বিশ্বাস। দিল্লির বাঙালি কবি ।
আপনার ম্যানেজার, মিঃ শেঠী, আপনার একটি
সাক্ষাৎকারের জন্য এই সময়টা ঠিক করে দিয়েছিলেন । আপনার মতো একজন শ্রদ্ধেয় এবং
কিংবদন্তী সাহিত্যিকের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি।
আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি অনুমতি দিলে এবং প্রস্তুত
থাকলে, আমরা কি শুরু করতে পারি?
[একজন দুর্বল
কিন্তু উজ্জ্বল চোখের মহিলা তার শাল ঠিক করে, তার নড়াচড়া
ধীর কিন্তু ইচ্ছাকৃত। সে উপরের দিকে তাকায়, চোখের চারপাশে
কুঁচকিতে খোদাই করা সত্ত্বেও তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, একটি মৃদু,
জ্ঞানী হাসি দেয়।]
সৎ শ্রী আকাল, পুত্তর। পীযূষকান্তি বিশ্বাস, তুমি
বলেছিলে? দিল্লি থেকে? আহ, দিল্লি... আমার মনে আছে যখন এই শহরটি আরও শান্ত, সবুজ
ছিল। এখন এটি তরুণদের মতো ছুটে আসে। হ্যাঁ, নব্বই বছর... এটা
নিজেই একটি গল্পের মতো মনে হয়, তাই না? এবং সেই সত্তরটি বছর ধরে জীবনের তামাশা কাগজে ধারণ করার চেষ্টা করে শব্দের
সাথে লড়াই করে কাটিয়েছি। সত্তর বছর... পৃথিবীর পালা, ঋতু
পরিবর্তন, সাম্রাজ্যের পতন, পাঞ্জাবের
হৃদয় জুড়ে নতুন সীমানা টানা... আমার হৃদয় জুড়ে।
[তিনি একটু সোজা
হয়ে বসেন, স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান যেন।]
অজিত ম্যাম, আপনি খুব অল্প বয়সে লেখালেখি শুরু করেছিলেন, দেশভাগের
আগের লাহোর এবং পরে দিল্লিতে চলে আসার অস্থির সময়ের মধ্যে। সেই প্রথম প্রেরণা,
সেই তীব্র প্রয়োজনটা কী ছিল যা একটি তরুণীকে গল্প বলার দিকে ঠেলে
দিয়েছিল ?
প্রথম লেখার ইচ্ছেটা... ঠিক কবে, কীভাবে এলো, তা বলা মুশকিল বাবা। ওটা তো কোনও
পরিকল্পনামাফিক হয়নি। লাহোরের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে... বেশ শান্ত, সবুজ শহর ছিল তখন। আমাদের বাড়ি, বাগান, স্কুল – সব মিলিয়ে একটা নিশ্চিত জীবন। কিন্তু তার ভেতরেও কোথায় যেন একটা
অস্থিরতা ছিল। মেয়েদের জীবন তো বরাবরই একটু অন্যরকম, তাই না?
অনেক নিয়ম, অনেক বারণ। আমার মনটা উড়ু উড়ু করত।
বই পড়তে ভালোবাসতাম খুব। গল্পের বইয়ের জগতে হারিয়ে যেতাম। মনে হত, আমিও যদি এমন করে লিখতে পারতাম!
তারপর এলো ১৯৪৭-এর সেই কালবৈশাখী। দেশভাগ। চোখের সামনে দেখলাম কত রক্ত, কত কান্না, কত ঘৃণা। ট্রেনে করে যখন ভিড়ের মধ্যে
মিশে, ভয়ে সিঁটিয়ে থেকে দিল্লি পৌঁছলাম, তখন মনে হল যেন এক জীবন থেকে ছিটকে অন্য এক অচেনা জীবনে এসে পড়েছি।
লাহোরের চেনা জগতটা হারিয়ে গেল। দিল্লিতে এসে নতুন করে সব শুরু করা, বাবার লড়াই, চারপাশের মানুষের সংগ্রাম – সব মিলিয়ে
এক দমবন্ধ করা অবস্থা। সেই সময়টায় আমার বয়স আর কতই বা হবে, চোদ্দো-পনেরো।
কিশোরী মন তখন দিশেহারা। চারদিকে এত প্রশ্ন, এত অনিশ্চয়তা,
এত দুঃখ – কাকে বলব? কে শুনবে? তখনই বোধহয় কলমটা আঁকড়ে ধরেছিলাম। না, ঠিক কলম নয়,
পেনসিল। পুরোনো খাতার পাতায় হিজিবিজি করে লিখতে শুরু করলাম। যা
দেখতাম, যা শুনতাম, যা মনে হত –
সব।
মনে আছে, প্রথম যে গল্পটা ছাপা হয়েছিল, তখন আমার বয়স ষোলো।
সেটা ছিল মেয়েদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে লেখা। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে সেদিন যে কী
আনন্দ হয়েছিল! কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, মনে হয়েছিল, আমার কথাগুলো তাহলে কারও না কারও কাছে পৌঁছচ্ছে।
আপনার লেখা
কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত এবং এতে নারীদের প্রতি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অবিচার থেকে
শুরু করে দেশভাগের যন্ত্রণা, মানব অবস্থার বৃহত্তর
জটিলতা পর্যন্ত অনেক কিছুই এসেছে। আপনি কি মনে করেন আপনার সমস্ত লেখার গভীরে একটি
কেন্দ্রীয় প্রশ্ন বা পুনরাবৃত্ত থিম রয়েছে যা সবসময়ই আপনার লেখার মূল স্পন্দন?
মূল স্পন্দন... হ্যাঁ, হয়তো আছে। এতদিন ধরে লিখছি, কত কী নিয়ে লিখেছি –
দেশভাগ, মেয়েদের জীবন, সম্পর্কের
জটিলতা, সমাজের নানান অসঙ্গতি... কিন্তু সবকিছুর গভীরে ডুব
দিলে মনে হয়, একটাই প্রশ্ন যেন বারবার ঘুরেফিরে এসেছে –
মানুষ কেন এত একা? কেন এত কষ্ট পায়? বিশেষ
করে মেয়েরা। তাদের জীবনটা যেন একটা খাঁচা। সেই খাঁচা কখনও সমাজের তৈরি, কখনও পরিবারের, কখনও বা নিজের মনের। এই খাঁচা ভাঙার
ছটফটানি, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা – এটাই বোধহয় আমার লেখার মূল
সুর।
'গুলবানো' বা 'পোস্ট মর্টেম'-এর মতো
গল্পে আমি নির্দিষ্টভাবে মেয়েদের বঞ্চনা, তাদের দমবন্ধ করা
জীবনের কথা বলেছি। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কীভাবে তাদের স্বপ্নগুলোকে পিষে ফেলে,
তাদের শরীরটাকে শুধু ভোগের বস্তু মনে করে – সেই সত্যিগুলো তুলে ধরতে
চেয়েছি। আবার 'খানাবাদোশ'-এ যখন নিজের
জীবনের কথা লিখেছি, সেখানেও তো বারবার এসেছে এই একাকীত্বের
বোধ, এই শিকড়হীনতার যন্ত্রণা। দেশভাগের ফলে যে শুধু ভিটেমাটি
হারিয়েছি তা নয়, হারিয়েছি একটা পরিচিত জগৎ, একটা নির্ভরতার জায়গা। তারপর থেকে জীবনটা যেন এক যাযাবরের যাত্রা। কোথায়
আমার ঘর? কোথায় আমার নিজের জায়গা? এই
প্রশ্নটা শুধু আমার নয়, আমার সময়ের অনেক মানুষের।
আসলে, আমি মনে করি, প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই একটা গভীর
শূন্যতা আছে। আমরা সবাই ভালোবাসা খুঁজি, আশ্রয় খুঁজি,
অর্থ খুঁজি। কিন্তু এই খোঁজার পথটা সহজ নয়। চারপাশে এত দেওয়াল –
ধর্মের, জাতের, লিঙ্গের, দেশের। এই দেওয়ালগুলো মানুষকে আরও একা করে দেয়, আরও
বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আমার লেখায় আমি এই দেওয়ালগুলোকেই ভাঙতে চেয়েছি। দেখাতে চেয়েছি,
সব দেওয়ালের ওপারে, সব পরিচয়ের আড়ালে যে
মানুষটা থাকে, তার ভেতরের কান্নাটা, তার
ভেতরের আকুতিটা একই।
দেশভাগ
পাঞ্জাবের আত্মার উপর একটি ক্ষত, এবং আপনি এর তাৎক্ষণিক
পরিণতির মধ্যে দিয়ে বেঁচে ছিলেন। এই ঘটনাটি, প্রাথমিক
স্থানচ্যুতি ছাড়াও, কীভাবে আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনে আপনার
কথাসাহিত্য এবং নন-ফিকশনের মানসিক পরিমণ্ডল এবং আখ্যানগুলিকে ক্রমাগত রূপ দিয়েছে?
দেশভাগ... ওটা শুধু একটা রাজনৈতিক
ঘটনা নয় বাবা, ওটা আমাদের প্রজন্মের কাছে একটা ব্যক্তিগত সর্বনাশ।
পাঞ্জাবের আত্মাটাকেই যেন দু'ফাঁক করে দেওয়া হয়েছিল। সেই
ক্ষতটা এতটাই গভীর যে সত্তর বছর পেরিয়ে এসেও মনে হয়, এই তো
সেদিনের ঘটনা। এর প্রভাব শুধু ভিটেমাটি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর চেয়েও
ভয়াবহ ছিল মানুষের মনের ভাঙচুর, বিশ্বাসের মৃত্যু।
আমরা যারা ওই সময়টা দেখেছি, তারা চোখের সামনে দেখেছি মানুষের ভেতরের পশুটাকে বেরিয়ে আসতে। প্রতিবেশী
প্রতিবেশীকে খুন করছে, বন্ধু শত্রুতে পরিণত হচ্ছে, ধর্ম হয়ে উঠছে বিভেদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সেই যে অবিশ্বাস, সেই যে ভয় – ওটা আমাদের রক্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। লাহোর থেকে দিল্লিতে
আসার সেই ট্রেন যাত্রার কথা আমি কোনওদিন ভুলব না। কামরা জুড়ে শুধু মানুষের আর্তনাদ
আর আতঙ্ক। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সব শেষ।
এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার লেখাকে
গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রথম দিকের গল্পগুলোতে এর সরাসরি ছাপ পাওয়া যায়।
উদ্বাস্তু কলোনির জীবন, হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের জন্য হাহাকার,
নতুন করে সব শুরু করার লড়াই – এগুলো বারবার এসেছে। কিন্তু শুধু
ঘটনার বিবরণ নয়, আমি চেষ্টা করেছি সেই সময়ের মানসিক অভিঘাতটা
ধরতে। মানুষের ভেতরের ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, পরিচয় সংকট – এগুলো কীভাবে তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত, তা দেখাতে চেয়েছি। দেশভাগের ফলে শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা বদলায়নি, মানুষের ভেতরের মানচিত্রটাও ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এর প্রভাব শুধু প্রথম
দিকের লেখাতেই থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়েও, যখন আমি সম্পর্ক বা
সামাজিক সমস্যা নিয়ে লিখেছি, তখনও দেশভাগের সেই ছায়াটা কোথাও
না কোথাও উঁকি দিয়ে গেছে। কারণ ওই ঘটনাটা আমাদের শিখিয়েছিল, জীবন
কত অনিশ্চিত হতে পারে, মানবতা কত ঠুনকো হতে পারে। সেই যে
একটা গভীর বিষাদ, একটা শিকড়হীনতার বোধ – ওটা আমার লেখার একটা
স্থায়ী অনুষঙ্গ হয়ে থেকে গেছে। 'খানাবাদোশ'-এ আমি লিখেছি, কীভাবে ওই ঘটনার পর থেকে নিজেকে সবসময়
একজন যাযাবর মনে হয়েছে। কোথাও যেন পুরোপুরি থিতু হতে পারিনি।
একটি আত্মজীবনী, 'খানাবাদোশ' (যাযাবর) লেখা নিশ্চয়ই একটি গভীর যাত্রা
ছিল। কী আপনাকে এটি লিখতে প্ররোচিত করেছিল, এবং আপনার নিজের
জীবনের 'গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা' এবং গভীর
ব্যক্তিগত সত্যগুলিকে মূল্যায়ন এবং রূপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
'খানাবাদোশ' লেখাটা... হ্যাঁ, একটা গভীর যাত্রা তো বটেই। যেন
নিজের জীবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে আবার হেঁটে যাওয়া। খুব সহজ ছিল না কাজটা।
অনেক সাহস সঞ্চয় করতে হয়েছিল। কী আমাকে প্ররোচিত করেছিল? সত্যি
বলতে কি, নির্দিষ্ট কোনও একটা কারণ ছিল না। বয়স বাড়ছিল,
শরীরটাও জানান দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যা কিছু
দেখেছি, যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু
হারিয়েছি – সেগুলোর একটা হিসেব মেলানো দরকার। অন্তত নিজের কাছে। জীবনটা তো সত্যিই
এক যাযাবরের মতো কেটেছে – লাহোর থেকে দিল্লি, তারপর কত
জায়গায় ঘোরাঘুরি, কত মানুষের সাথে মেশা, কত ভাঙাগড়া। এই সব অভিজ্ঞতাগুলো কোথাও একটা ধরে রাখা দরকার বলে মনে
হয়েছিল। হয়তো একটু ভারমুক্ত হওয়ার ইচ্ছাও ছিল। মনের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো বের
করে না দিলে যেন শান্তি পাচ্ছিলাম না।
অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল? একইসঙ্গে বেদনাদায়ক আর শুদ্ধিদায়ক। পুরোনো দিনের কথা মনে করতে গিয়ে কত যে
ধুলোমাখা স্মৃতি উঠে এলো! দেশভাগের সেই ভয়াবহ দিনগুলো, দিল্লিতে
এসে নতুন করে লড়াই শুরু করা, ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়া,
সম্পর্কের জটিলতা, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা –
সবকিছু যেন আবার নতুন করে বেঁচে উঠলাম। লিখতে গিয়ে অনেকবার চোখ জলে ভিজে গেছে। এমন
অনেক ঘটনা ছিল যা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, বা ভুলতে
চেয়েছিলাম। সেগুলোকে আবার টেনে বের করে আনা, তাদের মুখোমুখি
হওয়া – খুব কঠিন ছিল। বিশেষ করে যখন নিজের ভুলগুলো, নিজের
দুর্বলতাগুলো স্বীকার করতে হয়, তখন খুব কষ্ট হয়। আত্মজীবনী
লেখা মানে তো শুধু সাফল্যের গল্প বলা নয়, ব্যর্থতার কথাও
বলতে হয়। নিজের ভেতরের অন্ধকার দিকটাও তুলে ধরতে হয়। সেই সততাটা বজায় রাখা ছিল
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আবার অন্যদিকে, এই লেখার মধ্যে দিয়েই যেন একটা মুক্তিও খুঁজে পেয়েছিলাম। যে কথাগুলো এতদিন
বুকের ভেতর চেপে রেখেছিলাম, সেগুলো শব্দে প্রকাশ করার পর মনে
হল যেন একটা বোঝা নেমে গেল। জীবনের নানান ঘটনাগুলোকে একটা সূত্রে গাঁথার চেষ্টা
করলাম। কেন এমন হল? কেন আমি এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলাম?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজেকে যেন নতুন করে চিনলাম।
জীবনের অর্থটা কী, সেটা হয়তো পুরোপুরি বুঝলাম না, কিন্তু যাত্রাপথটাকে আরও একটু স্পষ্ট করে দেখতে পেলাম। ফেলে আসা দিনগুলোর
দিকে তাকিয়ে মনে হল, যা হয়েছে, ভালোর
জন্যই হয়েছে। প্রত্যেকটা অভিজ্ঞতা, তা সে যতই বেদনাদায়ক হোক
না কেন, আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে, আমাকে
আজকের আমি করে তুলেছে।
তাই বলব, 'খানাবাদোশ' লেখাটা আমার কাছে একটা তীর্থযাত্রার মতো
ছিল। পথে অনেক কাঁটা ছিল, অনেক অন্ধকার ছিল, কিন্তু শেষে একটা আলোর রেখাও দেখতে পেয়েছিলাম। এটা ছিল নিজের সাথে নিজের
একটা বোঝাপড়া। বেদনা আর মুক্তি – দুটো অনুভূতিই হাত ধরাধরি করে চলেছে পুরো
যাত্রাপথ জুড়ে। লেখার পর মনে হয়েছিল, হ্যাঁ, এই জীবনটা আমিই যাপন করেছি, এর সবটুকু ভালো-মন্দ
নিয়েই এটা আমার জীবন। এই স্বীকারোক্তিটাই ছিল সবচেয়ে বড় ক্যাথারসিস বা শুদ্ধি।
আপনি সৃজনশীল
প্রকাশের জন্য আপনার প্রাথমিক ভাষা হিসাবে পাঞ্জাবী বেছে নিয়েছিলেন। পাঞ্জাবী
ভাষার সাথে আপনার নিজের সম্পর্ক কেমন? আপনার গল্পগুলি এই
ভাষায় বলা আপনার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং আপনি আপনার জীবদ্দশায় এর
সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট কীভাবে পরিবর্তিত হতে দেখেছেন?
পাঞ্জাবী... এ তো শুধু একটা ভাষা
নয় বাবা,
এ আমার মা। এই ভাষাতেই আমি প্রথম হেসেছি, কেঁদেছি,
স্বপ্ন দেখেছি। আমার চিন্তা, আমার অনুভূতি –
সবকিছুর প্রথম প্রকাশ তো এই ভাষাতেই হয়েছে। তাই যখন লেখার কথা ভাবলাম, তখন অন্য কোনও ভাষার কথা মাথায়ই আসেনি। এটা ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে পছন্দের।
পাঞ্জাবী ভাষার সাথে আমার
সম্পর্কটা নাড়ির টানের মতো। এর শব্দগুলো, এর সুর, এর বাগধারা – সবকিছুর মধ্যে মিশে আছে আমার ছেলেবেলা, আমার সংস্কৃতি, আমার পাঞ্জাবের মাটির গন্ধ। এই ভাষার
মধ্যে একটা নিজস্ব শক্তি আছে, একটা রুক্ষতা আছে, আবার গভীর আবেগও আছে। আমার গল্পগুলো তো মূলত পাঞ্জাবের মানুষের গল্প,
তাদের জীবনের লড়াই, তাদের সুখ-দুঃখ, তাদের ভেতরের টানাপোড়েনের কথা। সেই কথাগুলো যদি আমি পাঞ্জাবীতে না বলতাম,
তাহলে আসল ভাবটা, আসল মেজাজটা আসত না। অন্য
ভাষায় অনুবাদ হয়তো করা যায়, কিন্তু সেই মাটির স্বাদটা,
সেই প্রাণের উষ্ণতাটা কি পুরোপুরি আনা সম্ভব? আমার
তো মনে হয় না।
কেন এই ভাষায় বলাটা গুরুত্বপূর্ণ
ছিল?
কারণ আমি চেয়েছিলাম আমার কথাগুলো সরাসরি আমার মানুষের কাছে পৌঁছক।
যারা আমার গল্পের চরিত্রগুলোর মতো জীবন যাপন করে, যারা একই
ভাষায় হাসে-কাঁদে, তারা যেন আমার লেখায় নিজেদের খুঁজে পায়।
ভাষা তো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা হল সংস্কৃতির ধারক,
পরিচয়ের বাহক। পাঞ্জাবী ভাষায় লিখে আমি আমার শিকড়ের সাথে জুড়ে থাকতে
চেয়েছি। দেশভাগের পর আমরা ভিটেমাটি হারিয়েছি, কিন্তু ভাষাটা
তো হারাইনি। এই ভাষাটাই ছিল আমাদের হারিয়ে যাওয়া পাঞ্জাবের সাথে সংযোগের সেতু।
সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে লিখছি, চোখের সামনে পাঞ্জাবী সাহিত্যের অনেক পরিবর্তন দেখেছি। যখন শুরু করেছিলাম,
তখন একদল প্রতিভাশালী লেখক ছিলেন – ভাই বীর সিং, ধনি রাম চাত্রিক, নানক সিং, গুরবখশ
সিং প্রীতলারি। তারপর এলেন আমার সময়ের লেখকরা – কর্তার সিং দুগ্গল, কুলবন্ত সিং ভির্ক, সন্তোখ সিং ধীর, আর অবশ্যই অমৃতা প্রীতম। আমরা নতুন বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করলাম, ভাষার ব্যবহারেও নতুনত্ব আনার চেষ্টা করলাম। বিশেষ করে মেয়েরা যখন তাদের
নিজেদের কথা লিখতে শুরু করল, তখন ভাষায় একটা নতুন
সংবেদনশীলতা এলো।
এখনকার তরুণ লেখকরা আরও সাহসী, আরও নিরীক্ষাধর্মী। তারা বিশ্বসাহিত্য পড়ছে, নতুন
নতুন আঙ্গিকে লিখছে। গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব, ডায়াস্পোরার
অভিজ্ঞতা – এগুলোও এখনকার পাঞ্জাবী সাহিত্যে জায়গা করে নিচ্ছে। এটা দেখে ভালো লাগে
যে ভাষাটা এখনও জীবন্ত, এখনও বিবর্তিত হচ্ছে। তবে হ্যাঁ,
একটা আশঙ্কাও হয়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঞ্জাবী পড়ার বা বলার
আগ্রহটা যেন একটু কমে আসছে। ইংরেজি বা হিন্দির দাপটে মাতৃভাষাটা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।
এটা শুধু পাঞ্জাবীর সমস্যা নয়, ভারতের অনেক আঞ্চলিক ভাষারই
এই অবস্থা। তবু আমি আশাবাদী। যতদিন পাঞ্জাবী মানুষ থাকবে, ততদিন
এই ভাষাটাও বেঁচে থাকবে, আর তার সাহিত্যও সমৃদ্ধ হতে থাকবে।
আমার মতো সামান্য লেখকের কাজ হল সেই ধারাটাকে একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এই আর কি।
আপনার স্পষ্ট
বর্ণনামূলক শৈলীকে মান্টো, বেদি, ইসমত
চুগতাই এবং কুলবন্ত সিং ভির্কের মতো ওস্তাদদের সাথে তুলনা করেছে। এই সমসাময়িকরা
ছাড়াও, অন্য কোনও লেখক, কবি, শিল্পী, বা এমনকি জীবনের অভিজ্ঞতা কি ছিল যা আপনার
বিশ্বকে দেখার এবং আপনার আখ্যানগুলি তৈরি করার পদ্ধতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল?
হ্যাঁ বাবা, মান্টো, বেদি, ইসমত, ভির্ক সাহেব – এঁদের লেখা আমাকে পথ দেখিয়েছে। এঁরা ছিলেন আয়নার মতো,
সমাজের কদর্যতা, ভণ্ডামি সবটাকেই সাহসের সাথে
তুলে ধরতেন। তাঁদের লেখায় কোনও আড়াল ছিল না, কোনও ভনিতা ছিল
না। এই সততাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে। তাঁদের মতো করে জীবনকে দেখতে শেখা,
তাঁদের মতো করে লিখতে পারার একটা গোপন ইচ্ছে আমার সবসময় ছিল।
কিন্তু এঁরা ছাড়াও আরও অনেকে আছেন
যাঁদের লেখা, কাজ বা জীবন আমাকে প্রভাবিত করেছে। রুশ সাহিত্যিকদের
কথা আগেই বলেছি – টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, চেখভ, গোর্কি। তাঁদের লেখার বিশাল ক্যানভাস, মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণ, আর সাধারণ
মানুষের প্রতি তাঁদের অপরিসীম মমতা – এগুলো আমাকে নাড়িয়ে দিত। মনে হত, সাহিত্য শুধু গল্প বলা নয়, সাহিত্য হল জীবনকে বোঝা
এবং ভালোবাসার একটা উপায়। ফরাসি লেখকদের মধ্যে সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর 'দ্য সেকেন্ড সেক্স' আমার চিন্তাভাবনাকে অনেকটা বদলে
দিয়েছিল। মেয়েদের অবস্থান নিয়ে, তাদের অধিকার নিয়ে নতুন করে
ভাবতে শিখিয়েছিল।
পাঞ্জাবী সাহিত্যের কথা বললে, ভাই বীর সিং-এর আধ্যাত্মিক কবিতা, পুরান সিং-এর
প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, আর অবশ্যই অমৃতা প্রীতমের লেখার
আগুন – এগুলোও আমাকে ছুঁয়ে গেছে। অমৃতা তো ছিলেন আমার অগ্রজ, তাঁর সাহস, তাঁর স্পষ্টবাদিতা আমাকে সবসময় প্রেরণা
জুগিয়েছে।
শুধু লেখক নন, শিল্পীরাও আমাকে প্রভাবিত করেছেন। আমার মেয়ে, অর্পণা
কৌর, সে একজন চিত্রকর। তার ছবি দেখা আমার কাছে একটা বড়
শিক্ষা। সে রং আর রেখার মাধ্যমে যা বলে, আমি চেষ্টা করি শব্দ
দিয়ে তা ধরতে। তার ছবিতে যে তীব্র আবেগ, যে প্রতিবাদ,
যে বিষণ্ণতা থাকে, সেগুলো আমাকে অন্যভাবে
জীবনকে দেখতে শেখায়। তার ছবির অনেক চরিত্র, অনেক ভাবনা আমার
লেখাতেও ছায়া ফেলেছে। আমরা মা-মেয়ে শুধু নই, আমরা একে অপরের
সহযাত্রী, সহকর্মী।
FOSWAL এবং আপনার
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, আপনি সাহিত্য ব্যবহার করে
সেতু তৈরির জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। সংঘাত, বিভেদ এবং
সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে সাহিত্যের কী শক্তি আছে বলে আপনি বিশ্বাস করেন? গল্প কি সত্যিই কঠিন বাস্তবতার মুখে কোনও পরিবর্তন আনতে পারে?
সাহিত্যের শক্তি... সে তো অপরিসীম
বাবা। অস্ত্র দিয়ে রাজ্য জয় করা যায়, কিন্তু মন জয় করতে পারে
শুধু শব্দ। বিশেষ করে যখন চারদিকে এত সংঘাত, এত বিভেদ,
এত ঘৃণা – তখন সাহিত্যের প্রয়োজন আরও বেশি করে অনুভূত হয়। কেন?
কারণ সাহিত্য পারে মানুষের ভেতরের দেওয়ালগুলো ভাঙতে।
FOSWAL (Foundation of SAARC Writers and
Literature) তৈরি করার পেছনে আমার এই বিশ্বাসটাই কাজ করেছিল। আমরা
সার্ক দেশগুলো – ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ,
শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান,
মালদ্বীপ, আফগানিস্তান – আমাদের মধ্যে কত মিল,
আবার কত অমিল! রাজনৈতিক কারণে আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে,
অবিশ্বাস জন্মেছে। কিন্তু আমাদের সাহিত্য, আমাদের
সংস্কৃতি, আমাদের মানুষের ভেতরের আকুতিগুলো তো প্রায় একইরকম।
আমি চেয়েছিলাম, এই দেশগুলোর লেখকরা একসাথে বসুক, কথা বলুক, নিজেদের লেখা পড়ুক। একে অপরকে চিনুক লেখক
হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে। যখন একজন পাকিস্তানি লেখকের গল্পে
আমি আমার দেশের কোনও মানুষের ছায়া খুঁজে পাই, বা একজন
বাংলাদেশি কবির কবিতায় আমার মনের কথা প্রতিধ্বনিত হতে দেখি, তখন
কি আর ওই রাজনৈতিক সীমারেখাটা বড় মনে হয়? মনে হয় না। তখন মনে
হয়, আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী।
সাহিত্য পারে সহানুভূতি তৈরি
করতে। যখন তুমি কোনও গল্প পড়ো, তখন তুমি সেই চরিত্রের জুতোয় পা
গলিয়ে তার জীবনটাকে অনুভব করার চেষ্টা করো। তার দুঃখটা তোমার দুঃখ হয়ে ওঠে,
তার আনন্দটা তোমার আনন্দ। এই সহানুভূতির বোধটাই পারে ঘৃণা আর
অবিশ্বাসের দেওয়াল ভাঙতে। সাহিত্য পারে প্রশ্ন তুলতে, আমাদের
চিন্তাভাবনাকে নাড়া দিতে। প্রচলিত ধ্যানধারণা, অন্যায়-অবিচার
– এগুলোর বিরুদ্ধে ভাবতে বাধ্য করে।
গল্প কি সত্যিই পরিবর্তন আনতে
পারে?
হ্যাঁ, পারে। হয়তো রাতারাতি বিপ্লব ঘটাতে পারে
না, কিন্তু মানুষের মনে পরিবর্তনের বীজ বুনে দিতে পারে। একটা
ভালো লেখা পড়ে হয়তো একজন মানুষ পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখতে শিখল, অন্য মানুষের প্রতি একটু বেশি সংবেদনশীল হল – এটাই তো পরিবর্তন। অনেকগুলো
ছোট ছোট পরিবর্তন মিলেই তো বড় পরিবর্তন আসে, তাই না? সাহিত্য পারে স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে। যে ঘটনাগুলো শাসক মুছে ফেলতে চায়,
যে কণ্ঠস্বরগুলো চেপে দিতে চায়, সাহিত্য
সেগুলোকে ধরে রাখে। দেশভাগের যন্ত্রণা, জরুরি অবস্থার
অন্ধকার – এগুলো তো সাহিত্যের মাধ্যমেই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে।
আপনার লেখা থেকে
টিকে থাকবে? এবং আমার মতো তরুণ লেখকদের জন্য, যারা আজ আমাদের নিজস্ব সাহিত্য যাত্রার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, আপনার নব্বই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আপনি কোন প্রজ্ঞা বা সতর্কতার কথা বলবেন?
কী টিকে থাকবে? সে তো মহাকাল জানে বাবা। আমি কে বলার? এই যে সত্তর
বছর ধরে কলম পিষছি, কত কী লিখেছি – গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ।
এর কতটা থাকবে, কতটা সময়ের স্রোতে ভেসে যাবে, তা আমি জানি না। সত্যি বলতে কি, ওটা নিয়ে আমি খুব
বেশি ভাবিও না। আমি শুধু চেয়েছি আমার সময়ের কথা, আমার দেখা
পৃথিবীর কথা, আমার ভেতরের অনুভূতিগুলোকে সৎভাবে লিখে যেতে।
যদি আমার কোনও লেখা পড়ে একজন পাঠকেরও মনে হয়, 'হ্যাঁ,
এই কথাটা তো আমারও মনে হয়েছিল', বা 'এই কষ্টটা তো আমিও চিনি', তাহলেই আমার লেখা সার্থক।
যদি আমার কোনও গল্প কাউকে একটু ভাবতে শেখায়, একটু থমকে
দাঁড়াতে বাধ্য করে, বা অন্যায় দেখে চুপ না থেকে প্রতিবাদ
করার সাহস জোগায় – তাহলে সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। টিকে থাকার আশা বলতে
এটুকুই। খ্যাতি, পুরস্কার – এগুলো তো বাইরের জিনিস, আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু পাঠকের মনের গভীরে যদি
একটু জায়গা করে নিতে পারি, সেটাই হবে আসল প্রাপ্তি।
সোভিয়েত
সাহিত্যের প্রতি আপনার একটা বিশেষ অনুরাগ ছিল বলে মনে হয়েছে সেই সাহিত্যের কোন
দিকগুলো আপনাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত? সেখানকার লেখকদের বিশাল
ক্যানভাস, সামাজিক দায়বদ্ধতা, নাকি
অন্য কিছু? এবং সেই সাহিত্য কি আপনার নিজের লেখাকে কোনওভাবে
প্রভাবিত করেছিল?
হ্যাঁ বাবা, ঠিকই ধরেছ। সোভিয়েত সাহিত্যের প্রতি আমার একটা টান ছিল, একটা মুগ্ধতা ছিল। বিশেষ করে তাদের সাহিত্যের যে বিশাল ব্যাপ্তি (scale),
যে গভীরতা – সেটা আমাকে খুব আকর্ষণ করত। তারা যখন লিখত, তখন যেন গোটা একটা যুগ, গোটা একটা দেশের উত্থান-পতন
চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠত। ছোটখাটো ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে তারা লিখত না তা নয়,
কিন্তু তাদের লেখার ক্যানভাসটা ছিল অনেক বড়। বিপ্লব, যুদ্ধ, একটা নতুন সমাজ গড়ার সংগ্রাম, সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধ – এই সব বিশাল বিশাল বিষয় নিয়ে তারা লিখত।
তাদের লেখকদের মধ্যে একটা তীব্র
সামাজিক দায়বদ্ধতার বোধ ছিল। সাহিত্যকে তারা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ বা
বিনোদন হিসেবে দেখত না। তাদের কাছে সাহিত্য ছিল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, ইতিহাসের সাক্ষী। গোর্কি, মায়াকোভস্কি, শোলোখভ – এঁদের লেখায় সেই সময়ের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, তাদের যন্ত্রণা, তাদের লড়াইয়ের ছবি ফুটে উঠত। তারা
শুধু গল্প বলত না, তারা যেন একটা গোটা সময়কে ধরে রাখত তাদের
লেখার মধ্যে। এই বিষয়টা আমাকে খুব নাড়া দিত। আমিও তো বিশ্বাস করি যে লেখক সমাজের
বাইরে নয়, তার লেখার একটা দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। হয়তো সেই কারণেই
তাদের লেখার এই দিকটা আমার এত ভালো লাগত।
অবশ্য, সবটাই যে শুধু ভালো ছিল তা নয়। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেন্সরশিপ ছিল। লেখকদের অনেককেই অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, যেমন ধরো পাস্তেরনাক বা সলঝেনিৎসিন। সব লেখা হয়তো সবসময় সত্যি কথা বলতে
পারত না, অনেক কিছু হয়তো ইঙ্গিতে বলতে হত। কিন্তু এই
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যে অসাধারণ সাহিত্য তৈরি হয়েছে, তার
জোরটাকে অস্বীকার করা যায় না।
আমার নিজের লেখাকে প্রভাবিত
করেছিল কিনা? সরাসরি হয়তো কোনও অনুকরণ করিনি। কিন্তু তাদের লেখার ওই
বিশালতা, ওই জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, ওই
সোজাসাপ্টা বলার ভঙ্গি – এগুলো নিশ্চয়ই আমার মনের গভীরে কোথাও ছাপ ফেলেছিল। বিশেষ
করে মানুষের সংগ্রামকে, ইতিহাসের বাঁকবদলকে সাহিত্যের বিষয়
করে তোলার যে চেষ্টা, সেটা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। জীবনের
রুক্ষ বাস্তবতাকে এড়িয়ে না গিয়ে তার মুখোমুখি হওয়ার যে সাহস তাদের লেখায় পেতাম,
সেটা আমার নিজের লেখার দর্শনকেও হয়তো কিছুটা প্রভাবিত করেছে। তাই
বলব, সোভিয়েত সাহিত্য আমার কাছে শুধু পড়ার বিষয় ছিল না,
সেটা ছিল একটা বিরাট শিক্ষাও।
আপনার লেখা
পাঞ্জাবী ছাড়াও ভারতের এবং বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কোন কোন ভাষায়
আপনার কাজের অনুবাদ হয়েছে এবং এই অনুবাদগুলো সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী? আপনার লেখা ভিন্ন ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছচ্ছে, এটা
আপনাকে কীভাবে অনুপ্রাণিত করে?
হ্যাঁ বাবা, এ আমার পরম সৌভাগ্য যে আমার মাতৃভাষা পাঞ্জাবীর গণ্ডি পেরিয়ে আমার কথাগুলো
আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছে। সবচেয়ে বেশি অনুবাদ তো হয়েছে ইংরেজি আর
হিন্দিতে। ইংরেজিতে বোধহয় গোটা দশেক বই আছে । হিন্দিতেও বেশ কয়েকটা বই আছে,
যেমন 'খানাবাদোশ', 'কুড়া
কবাড়া', 'গৌরী', 'পোস্টমর্টেম'। দিল্লির মতো জায়গায় থাকি, তাই এই দুটো ভাষায়
অনুবাদ হওয়াটা স্বাভাবিক।
কিন্তু শুধু এই দুটো ভাষাতেই নয়।
জেনে অবাক হবে, আমার লেখা প্রায় ১৬-১৭টা বই মালয়ালম ভাষায় অনূদিত
হয়েছে! কীভাবে হল, কে করাল – সবটা আমার মনেও নেই। আবার
বাংলাতেও প্রায় দশটার মতো বই অনুবাদ হয়েছে, যেমন তোমরা বললে 'যাযাবর' ('খানাবাদোশ'-এর
অনুবাদ)। অসমীয়া, ওড়িয়া, গুজরাটি,
কন্নড়, মারাঠি – এই সব ভাষাতেও কিছু কিছু কাজ
গেছে।
আর একটা মজার কথা বলি। দেশভাগের
ফলে পাঞ্জাব তো দু'টুকরো হয়ে গেল। আমরা যারা ভারতে রয়ে গেলাম,
তারা লিখি গুরুমুখী হরফে। আর যারা পাকিস্তানে চলে গেল, তারা পাঞ্জাবী লেখে শাহমুখী হরফে, যেটা আসলে ফার্সি
হরফ। তো, আমার বইগুলো পাকিস্তানে শাহমুখীতে লিপ্যন্তরিত (transcribed)
হয়ে ছাপা হয়, যাতে ওখানকার পাঞ্জাবী পাঠকরাও
পড়তে পারে। এটা ঠিক অনুবাদ নয়, কিন্তু হরফটা বদলে দেওয়া
আরকি। কারণ গুরুমুখী তো ওরা পড়তে পারে না।
এই যে আমার লেখা এতগুলো ভাষায়
যাচ্ছে,
এটা দেখলে খুব আনন্দ হয়, একটা গভীর তৃপ্তি
পাই। মনে হয়, আমি যে কথাগুলো বলতে চেয়েছি, যে যন্ত্রণা, যে লড়াইয়ের ছবি আঁকতে চেয়েছি, তা শুধু আমার বা পাঞ্জাবের মানুষের কথা নয়, তা হয়তো
সব মানুষেরই কথা। নাহলে অন্য ভাষার পাঠকরা কেন আমার লেখায় নিজেদের খুঁজে পাবে?
আপনার কোন কোন
লেখা সিনেমা বা দূরদর্শনের জন্য সিরিয়াল বা টেলিফিল্ম হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে? নিজের সৃষ্টিকে পর্দায় দেখার অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?
[তিনি একটু হাসেন,
যেন পুরোনো দিনের রুপোলি পর্দার কথা মনে পড়েছে।]
হ্যাঁ বাবা, হয়েছে বইকি! কলমের কালিতে গড়া আমার চরিত্রগুলো, আমার
গল্পগুলো যে কখনও কখনও হেঁটে চলে বেড়াবে পর্দার আলো-আঁধারিতে, এটা ভাবতেও বেশ লাগে! তখনকার দিনে তো দূরদর্শনই ছিল ভরসা, এখনকার মতো এত চ্যানেল, এত হইচই তো ছিল না।
আমার ঠিক ঠিক যা মনে পড়ছে, আমার একটা গল্প ছিল – 'না মারো' (Na Maro)। খুব সম্ভব মারধোর বা হত্যার বিরুদ্ধে কিছু একটা হবে, নামটা শুনে তাই মনে হচ্ছে। সেই গল্পটা নিয়ে দূরদর্শনে ১৩টা পর্বের একটা
সিরিয়াল হয়েছিল। বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল বলেই শুনেছিলাম।
আরেকটা গল্প ছিল, 'মম্মী' (Mummy) নামে। সেটা নিয়েও একটা ফিল্ম হয়েছিল,
বোধহয় টেলিফিল্মই হবে। নিজের গল্পকে পর্দায় চরিত্র নিয়ে নড়াচড়া করতে
দেখা, কথা বলতে দেখা – সে এক অন্যরকম অনুভূতি বাবা! কেমন যেন
নিজের সন্তানকে নতুন রূপে দেখার মতো।
আর একটা পাঞ্জাবী ফিল্মও হয়েছিল
আমার কোনও একটা লেখা নিয়ে। পাঞ্জাবী না হিন্দি ঠিক মনে পড়ছে না, তবে খুব নামকরা প্যারালাল সিনেমার (Parallel Cinema) ধারাতেই কাজটা হয়েছিল। খুব বিখ্যাতও হয়েছিল ছবিটা। এই বুড়ো বয়সে সব নামধাম
কি আর মনে থাকে বাবা! তবে হ্যাঁ, আমার লেখা যে শুধু বইয়ের
পাতায় আটকে না থেকে আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছে এই সিনেমা বা সিরিয়ালের
মাধ্যমে, এটা ভেবে খুব ভালো লাগে।
[তিনি চশমাটা নাকের
ডগায় একটু ঠিক করে নিলেন, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।]
লেখকের সামাজিক
দায়বদ্ধতা বলতে আপনি ঠিক কী বোঝেন? আপনার কি মনে হয় একজন
লেখকের কাজ শুধু শিল্পসৃষ্টি, নাকি সমাজের প্রতি, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তার কলম ধরাটাও জরুরি? আপনি
নিজে এই দুইয়ের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রেখেছেন?
সামাজিক দায়বদ্ধতা... আমার কাছে
এটা কোনও আলাদা করে চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব নয় বাবা। এটা লেখকের সত্তারই একটা অংশ
হওয়া উচিত। আমি তো আকাশ থেকে পড়িনি, এই সমাজেই আমার জন্ম,
বেড়ে ওঠা। চারপাশের মানুষের হাসি-কান্না, তাদের
লড়াই, তাদের বঞ্চনা – এগুলো যদি আমাকে নাড়া না দেয়, তাহলে আমি কেমন লেখক? আমার লেখা যদি আমার সময়ের আয়না
না হয়, তাহলে সেই লেখার দাম কী?
শিল্পসৃষ্টি নিশ্চয়ই লেখকের প্রথম
কাজ। লেখার একটা নিজস্ব ছন্দ আছে, সৌন্দর্য আছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্য
যদি জীবনের কঠিন সত্যিগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে সেটা
তো শুধু এক ধরনের পালানো। আমি মনে করি, একজন লেখকের চোখ আর
কান দুটোই খোলা রাখা দরকার। সে যা দেখবে, যা শুনবে, যা অনুভব করবে – তা সে তার লেখার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করবে। আর সেই দেখা বা
শোনার মধ্যে যদি অন্যায় থাকে, অবিচার থাকে, তাহলে সেটা নিয়ে কথা বলাটাও তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কলম তো শুধু
ফুল-পাখির গল্প লেখার জন্য নয়, কলম হতে পারে প্রতিবাদের
অস্ত্র, বিবেকের কণ্ঠস্বর।
ভারসাম্য? আমি কোনওদিন ওভাবে মেপে দেখিনি বাবা। যখন যা আমাকে নাড়া দিয়েছে, যা আমাকে যন্ত্রণা দিয়েছে, যা আমাকে ভাবিয়েছে – আমি
তাই লিখেছি। যখন দেশভাগের সেই ভয়াবহতা দেখেছি, তখন সেটা নিয়ে
লিখেছি। যখন দেখেছি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের দমবন্ধ করা অবস্থা, তখন তাদের কথা লিখেছি। যখন দেখেছি ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে মারছে,
তখন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। এগুলো লিখতে গিয়ে লেখার
শিল্পগুণ নষ্ট হল কিনা, সেই হিসেব আমি করিনি। আমার কাছে
সত্যিটা বলাটাই ছিল আসল।
আপনার
গল্প-উপন্যাসে আমরা অনেক 'আধুনিক' নারীর
চরিত্র পাই, যারা প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে বাঁচার চেষ্টা
করেছে। তাদের যাত্রাপথটা কেমন ছিল? সময়ের সাথে সাথে
নারীচেতনার এই বিবর্তন এবং আজকের দিনের 'আধুনিক' নারীদের চ্যালেঞ্জগুলো আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
হ্যাঁ, আমার লেখায় এমন অনেক মেয়েদের কথা আছে, যারা সমাজের
বেঁধে দেওয়া গণ্ডির বাইরে পা ফেলতে চেয়েছে। তারা শিক্ষিত হতে চেয়েছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছে, নিজের পছন্দের মানুষকে
ভালোবাসতে চেয়েছে, অথবা শুধু নিজের মতো করে একটু শ্বাস নিতে
চেয়েছে। এদের 'আধুনিক' বলব কিনা জানি
না, তবে তারা নিশ্চয়ই বিদ্রোহী ছিল – প্রচলিত ব্যবস্থার
বিরুদ্ধে তাদের মনে প্রশ্ন ছিল, ক্ষোভ ছিল।
তাদের যাত্রাপথটা মোটেও সহজ ছিল
না বাবা। পদে পদে ছিল বাধা, সমালোচনা, লাঞ্ছনা।
পরিবার থেকে, সমাজ থেকে – সবদিক থেকেই তাদের দমিয়ে রাখার
চেষ্টা হয়েছে। কেউ হয়তো লড়াই করে কিছুটা জয়ী হয়েছে, কেউ হয়তো
মাঝপথে হেরে গেছে, কেউ বা আপোষ করে নিয়েছে। আমি তাদের ভেতরের
সেই দ্বন্দ্বটা, সেই লড়াইটাকেই ধরতে চেয়েছি। তারা হয়তো সবসময়
সফল হয়নি, কিন্তু তারা যে প্রশ্নগুলো তুলেছিল, যে স্বপ্নগুলো দেখেছিল – সেটাই ছিল বড় কথা। তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য
পথ তৈরি করে দিয়ে গেছে।
সময়ের সাথে সাথে নারীচেতনার
বিবর্তন তো হয়েছেই। আমার সময়ের চেয়ে আজকের মেয়েরা অনেক বেশি সচেতন, অনেক বেশি সাহসী। শিক্ষা বেড়েছে, কাজের সুযোগ বেড়েছে,
নিজেদের অধিকার সম্পর্কে তারা এখন অনেক বেশি ওয়াকিবহাল। তারা এখন
প্রশ্ন করতে ভয় পায় না, প্রতিবাদ করতে পিছপা হয় না। এটা
নিঃসন্দেহে একটা বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন। মেয়েরা এখন শুধু ঘরের চৌহদ্দিতে আটকে নেই,
তারা বাইরের জগতেও নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে – রাজনীতি, ব্যবসা, বিজ্ঞান, শিল্পকলা –
সব ক্ষেত্রেই তাদের বিচরণ।
তাই বলব, নারীচেতনার বিবর্তন ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু লড়াইটা এখনও
শেষ হয়নি। পথটা হয়তো কিছুটা মসৃণ হয়েছে, কিন্তু গন্তব্যে
পৌঁছতে এখনও অনেক দূর যেতে হবে। আজকের মেয়েদের লড়াইটা আরও জটিল, আরও বহুমুখী। তাদের একদিকে যেমন বাইরের জগতের সাথে লড়তে হচ্ছে, তেমনি লড়তে হচ্ছে সমাজের গভীরে প্রোথিত পুরোনো মানসিকতার বিরুদ্ধেও। তবে
আমি আশাবাদী। মেয়েরা যেভাবে এগিয়ে আসছে, তাতে মনে হয়,
তারা একদিন এই সব বাধা অতিক্রম করবেই।
আপনার দীর্ঘ
সাহিত্য জীবনে দিল্লির বহু লেখকের সাথেই নিশ্চয়ই আপনার পরিচয় বা যোগাযোগ হয়েছে।
সেই সময়ের দিল্লির সাহিত্যিক পরিমণ্ডলটা কেমন ছিল? লেখকদের মধ্যে কি কোনও আড্ডা বা পারস্পরিক আদানপ্রদানের চল ছিল, নাকি প্রত্যেকেই নিজের জগতে মগ্ন থাকতেন?
আরে বাবা, সে এক সময় ছিল! এখনকার মতো এত দৌড়াদৌড়ি, এত মোবাইল
ফোনের টিং টাং ছিল না। মানুষের হাতে সময় ছিল, একে অপরের বাড়ি
যাওয়ার, বসে আড্ডা দেওয়ার। দিল্লির সাহিত্যিক পরিমণ্ডলটা...
ঠিক কেমন ছিল বলা মুশকিল, কারণ দিল্লি তো অনেকগুলো শহর
একসাথে। এখানে হিন্দি লেখকদের একটা বড় জগৎ ছিল, উর্দু
শায়েরির একটা পুরোনো ঐতিহ্য ছিল, আবার দেশভাগের পর আমাদের
মতো পাঞ্জাবী লেখকরা এসে একটা নতুন ধারা তৈরি করেছিলাম। ইংরেজি লেখকরাও ছিলেন।
তবে হ্যাঁ, একটা আদানপ্রদান তো ছিলই। একেবারে যে যার নিজের জগতে মগ্ন থাকত, তা নয়। কনট প্লেসের কফি হাউসে, বা পুরোনো দিল্লির
গলিতে লেখকদের আড্ডা বসত। সাহিত্য আকাদেমির অনুষ্ঠানে দেখা হত, বিভিন্ন সভা-সমিতিতে লেখা পড়া হত, তর্ক-বিতর্ক হত।
মনে পড়ে, ভীষ্ম সাহনী (Bhisham Sahni), নির্মল ভার্মা (Nirmal Verma) – এঁদের মতো হিন্দি
লেখকদের সাথে দেখা হত, কথা হত। রাজিন্দর সিং বেদী (Rajinder
Singh Bedi) যখন দিল্লিতে থাকতেন, তাঁর সাথেও
যোগাযোগ ছিল। পাঞ্জাবী লেখকদের তো একটা নিজস্ব গোষ্ঠী ছিলই।
তবে সত্যি বলতে কি, খুব গভীর বন্ধুত্ব বা সাহিত্যিক আন্দোলনের মতো কিছু আমি খুব বেশি দেখিনি।
প্রত্যেকেই নিজের লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। হ্যাঁ, একে অপরের
লেখা পড়তেন, আলোচনা করতেন, কখনও সখনও
প্রশংসাও করতেন, আবার ভেতরে ভেতরে একটু প্রতিদ্বন্দ্বিতাও
হয়তো ছিল। কারণ দিল্লি তো ক্ষমতারও শহর, এখানে স্বীকৃতির
জন্য একটা দৌড় তো থাকেই।
আমি নিজে পরে যখন FOSWAL বা Academy of Fine Arts and Literature তৈরি করলাম,
তখন চেষ্টা করেছিলাম এই আদানপ্রদানের জায়গাগুলো আরও বাড়াতে, বিভিন্ন ভাষার লেখকদের এক ছাদের তলায় আনতে। কারণ আমার মনে হয়েছিল, এই বিচ্ছিন্নতাটা ঠিক নয়। লেখকদের মধ্যে যত বেশি কথাবার্তা হবে, আড্ডা হবে, ততই তো সবার ভালো। তবে এখনকার দিনে তো
পরিস্থিতি আরও বদলে গেছে। সবাই বড্ড একা, বড্ড আত্মকেন্দ্রিক
হয়ে গেছে। সেই পুরোনো দিনের আড্ডাগুলো আর বড় একটা দেখা যায় না।
দিল্লি ভারতের রাজধানী, ক্ষমতার কেন্দ্র, আবার নানা ভাষা ও সংস্কৃতির
মিলনক্ষেত্রও বটে। একজন লেখক হিসেবে দিল্লির এই বহুস্তরীয় চরিত্র আপনার বা আপনার
সমসাময়িকদের লেখাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল? এখানকার
সাহিত্যিক চর্চায় কি রাজধানীর রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তাপের কোনও বিশেষ প্রতিফলন
দেখা যেত?
দিল্লির প্রভাব? সে তো থাকবেই বাবা। এই শহরটার চরিত্রটাই এমন যে একে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
এটা শুধু রাজধানী নয়, এটা একটা ইতিহাসের স্রোত, যেখানে কত সাম্রাজ্য গড়েছে, ভেঙেছে। দেশভাগের পর তো
লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে এই শহরে নতুন জীবন শুরু করেছে, তাদের
যন্ত্রণা, তাদের লড়াই – সব এই শহরের বাতাসে মিশে আছে। আবার
ক্ষমতার কেন্দ্র হওয়ার কারণে রাজনীতির খেলা, তার ভালো-মন্দ
প্রভাব – সবই এখানে খুব কাছ থেকে দেখা যায়।
আমার নিজের লেখার কথাই ধরো।
দেশভাগের পর দিল্লিতে এসে যে উদ্বাস্তু কলোনির জীবন দেখলাম, যে অনিশ্চয়তা, যে সংগ্রাম – সেগুলো তো আমার প্রথম
দিকের লেখার ভিত গড়ে দিয়েছিল। '৮৪-র দাঙ্গা বা ইমার্জেন্সি –
এই ঘটনাগুলো দিল্লিতে বসেই দেখেছি, অনুভব করেছি, তাই এগুলো নিয়ে না লিখে পারিনি। দিল্লির এই রুক্ষ বাস্তবতাই হয়তো আমার
লেখার ভঙ্গিটাকে সোজাসাপ্টা, অলংকারহীন করে তুলেছে। এখানে
বসে ফুল-পাখির স্বপ্ন দেখা কঠিন।
আমার সমসাময়িক অন্য লেখকদের
লেখাতেও দিল্লির এই বহুস্তরীয় চরিত্রের ছাপ স্পষ্ট। ভীষ্ম সাহনীর 'তমস'
উপন্যাসে দেশভাগের অভিঘাত দিল্লিতে কীভাবে এসে পড়েছিল, তার ছবি আছে। নির্মল ভার্মার লেখায় দিল্লির একাকিত্ব, আধুনিক জীবনের জটিলতা ধরা পড়েছে। কৃষ্ণা সোবতির (Krishna Sobti) লেখায় পুরোনো দিল্লির ভাষা, তার জীবনযাত্রার অনবদ্য
বর্ণনা পাওয়া যায়। উর্দু শায়েরিতে তো দিল্লির উল্লেখ বারবার এসেছে – এখানকার
বদলানো চেহারা, এখানকার মানুষের মেজাজ।
আর রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তাপের
প্রতিফলন?
সে তো থাকবেই। রাজধানী হওয়ার সুবাদে সব বড় বড় ঘটনা তো এখানেই ঘটে বা
তার ঢেউ এখানে এসেই লাগে। লেখকরা তো সমাজেরই অংশ। তাই তাঁদের লেখায় সেই সময়ের ছাপ
পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কেউ হয়তো সরাসরি লিখেছেন, কেউ বা ইঙ্গিতে বলেছেন। তবে দিল্লির লেখকদের পক্ষে সমসাময়িক বাস্তবতা থেকে
চোখ ফিরিয়ে থাকাটা খুব কঠিন ছিল। এই শহরটা তোমাকে বাধ্য করে তাকাতে, ভাবতে, প্রশ্ন করতে। আমার মনে হয়, দিল্লির এই কঠিন, জটিল বাস্তবতাই এখানকার সাহিত্যকে
একটা বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। এটা শুধু কল্পনাবিলাস নয়, এটা
জীবনের রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহিত্য।
যেভাবে পাঞ্জাব
বিভক্ত হয়ে যায়, সেইভাবেই বিভক্ত হয়ে যায় বাংলা ।
পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ । পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্থান নামে অবিহিত ছিলো, এবং একাত্তরে তারা স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ নামে পরিচিত হয় । আপনার সমগ্র
বাংলা ভাষার সাহিত্য চর্চা , তাদের সংস্কৃতি নিয়ে কি ধারনা
রয়েছে ?
আহ্, বাংলা সাহিত্য! সে তো এক মহাসমুদ্র বাবা! আমি নিজে পাঞ্জাবীতে লিখি,
কিন্তু বাংলা সাহিত্যের প্রতি আমার টান আর শ্রদ্ধা দুটোই খুব গভীর।
দু'বাংলার কথাই জানতে চাইছ? বেশ,
আমার যা সামান্য ধারণা, তাই বলছি।
[তিনি একটু গুছিয়ে
বসেন, যেন একটা বড় বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করছেন।]
বাংলা সাহিত্য তো রবীন্দ্রনাথকে
দিয়েই শুরু করতে হয়। তিনি তো শুধু বাংলার নন, সারা বিশ্বের। তাঁর পর
এসেছেন কত দিকপাল – শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর... আমি যখন বড় হচ্ছি, তখন তাঁদের লেখার
সাথেই পরিচয়। তারপর এলো কল্লোল যুগ, আধুনিকতার ঢেউ লাগল
সাহিত্যে। আমার সমসাময়িক বা তার কিছু পরের লেখকদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী – এঁদের
নাম তো বলতেই হয়। কলকাতায় একটা দারুণ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, আড্ডার
পরিবেশ ছিল, যদিও হয়তো দিল্লির মতো অতটা বহুভাষিক নয়।
আমার যা মনে হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের লেখায় শহুরে জীবনের জটিলতা, মধ্যবিত্তের
সংকট, রাজনৈতিক আলোড়ন (যেমন নকশাল আন্দোলনের সময়ের লেখা) –
এই বিষয়গুলো খুব জোরালোভাবে এসেছে। একটা রোমান্টিকতার ধারাও ছিল, আবার গভীর সামাজিক বিশ্লেষণও ছিল। তবে হ্যাঁ, লেখকদের
অর্থনৈতিক দুর্দশার কথাটা যা শুনলাম তোমার কাছে (যে পকেট থেকে টাকা দিয়ে বই ছাপতে
হয়), সেটা খুব দুঃখের। এত সমৃদ্ধ একটা সাহিত্যিক ঐতিহ্য,
অথচ লেখকদের এই অবস্থা!
আর বাংলাদেশের সাহিত্যের সাথে
আমার পরিচয়টা মূলত FOSWAL-এর সূত্র ধরে। সেখানে গিয়ে, সেখানকার লেখকদের সাথে মিশে আমি অভিভূত হয়ে গেছি! তাঁদের ভাষার প্রতি যে
টান, যে ভালোবাসা, সেটা অসাধারণ।
দেশভাগের যন্ত্রণা, তারপর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ – এই দুটো
ঘটনা তাঁদের সাহিত্যকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। ভাষার জন্য লড়াই, স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ, জাতীয় পরিচয়ের সন্ধান –
এই থিমগুলো তাঁদের লেখায় বারবার ঘুরেফিরে আসে।
শামসুর রহমানের কথা তো আগেই বলেছি, তাঁকে তো বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের পরেই স্থান দেওয়া হয়। কী শক্তিশালী তাঁর
কবিতা! নূরুল হুদা, সেলিনা হোসেন – এঁদের মতো আরও অনেক গুণী
লেখক আছেন। তাঁদের লেখায় মাটির কাছাকাছি থাকার একটা চেষ্টা, সাধারণ
মানুষের জীবনের সংগ্রাম, এবং একইসাথে একটা আন্তর্জাতিক
দৃষ্টিভঙ্গিও লক্ষ্য করেছি। তাঁদের লেখায় একটা আলাদা তেজ আছে, একটা লড়াকু মেজাজ আছে।
বাংলা কবিতা ও
সুনীল গাঙ্গুলীকে কতোটা চিনতেন ? তিনি একসময় দীর্ঘদিন
দিল্লিতে বিচরণ করেছেন, সাহিত্য একাডেমিতে চেয়ারম্যান ছিলেন
।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? হ্যাঁ বাবা, নামটা কে না চেনে! চিনতাম তো বটেই। তিনি
যখন সাহিত্য আকাদেমির চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন দেখা হয়েছে
অনুষ্ঠানে, দিল্লিতেও। এস. এস. নূর (S.S. Noor) তখন ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন, সে সব মনে আছে। আমাদের
আলাপ ছিল, দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে।
তবে সত্যি কথা বলতে কি বাবা, মানুষটাকে আমার খুব একটা পছন্দ ছিল না। কেন জানি না... মনে হত... তিনি
একটু ইতস্তত করেন, তারপর বলেন, থাক সে
কথা। সবার সাথে তো আর সবার মনের মিল হয় না, তাই না? ব্যক্তিগতভাবে উনি আমার জন্য কিছু করেছেন বলেও মনে পড়ে না, বা হয়তো আমার সাথে ওঁর ঠিক সুর মিলত না।
কিন্তু লেখক হিসেবে তিনি অবশ্যই
বড় মাপের ছিলেন, বিশেষ করে বাংলার সাহিত্য জগতে তাঁর অবদান তো
অনস্বীকার্য। 'সেই সময়' বা তাঁর কবিতা
– সে তো অন্য জগৎ। অনেক মানুষ তাঁকে ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা
করতেন।
আপনি বাংলাদেশের
অন্যান্য কবিদের যেমন শামসুর রহমান সাথে আপনার সম্পর্কের কথা বলেছেন। এই
আন্তঃসীমান্ত সাহিত্যিক বন্ধুত্ব কীভাবে গড়ে উঠেছিল এবং FOSWAL-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে তা বজায় রাখতে কেমন লেগেছে?
এই বন্ধুত্বগুলো গড়ে উঠেছে এই
আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়েই। ফেস্টিভ্যালে দেখা হওয়া, একে অপরের লেখা
পড়া, আড্ডা দেওয়া – এভাবেই তো মনের মিল হয়। প্রথম প্রথম হয়তো
একটু জড়তা থাকে, কিন্তু আস্তে আস্তে দেওয়ালগুলো ভেঙে যায়।
তখন আর কে কোন দেশের, সেটা বড় কথা থাকে না।
এই সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখতে খুব
ভালো লাগে। মনে হয়, রাজনীতির ব্যর্থতাগুলোকে আমরা অন্তত কলম
দিয়ে জোড়া লাগাতে পারছি। এটা একটা বিরাট প্রাপ্তি। যদিও এখন পরিস্থিতি আবার একটু
কঠিন হয়েছে, তবু আমি আশা ছাড়িনি। লেখকদের মধ্যে এই
বন্ধুত্বটা খুব জরুরি, এটা আমাদের আরও মানবিক করে তোলে।
আপনি এখন লেখার
জন্য আপনার মেয়ের (অর্পণা) এবং অন্য কারো সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল, কারণ আপনার দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে । একজন লেখক হিসেবে এই পরিবর্তন আপনার
সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে? এটা কি খুব
যন্ত্রণার?
হ্যাঁ বাবা, চোখ দুটো আর আগের মতো নেই। এখন আর অক্ষরগুলো স্পষ্ট দেখতে পাই না। বই পড়তে
পারি না, শুধু বড় বড় হরফ যা একটু চোখে পড়ে। লেখার সময়ও তাই,
কাগজ দেখি না, শুধু কলমটা চালাই, হিজিবিজি করে যাই (scribble)। অর্পণা
(আমার মেয়ে) সেগুলো উদ্ধার করে ঠিকঠাক করে দেয়, তারপর অন্য কেউ টাইপ করে
দেয়। এইভাবেই চলছে আজকাল।
এটা যন্ত্রণার কিনা? হ্যাঁ, কিছুটা তো বটেই। একজন লেখকের কাছে তার চোখ
দুটো তো সবচেয়ে বড় সম্পদ। নিজের লেখাটা নিজে পড়তে না পারা, নিজের
হাতে ফাইনাল কপিটা তৈরি করতে না পারা – এটা নিশ্চয়ই কষ্টের। মাঝে মাঝে খুব অসহায়
লাগে। মনে হয়, কলমটা আছে, কিন্তু সেটা
ঠিকমতো ব্যবহার করার ক্ষমতাটাই চলে যাচ্ছে।
কিন্তু জানো তো, মানুষ সবকিছুর সাথেই মানিয়ে নিতে শেখে। আমিও শিখেছি। এই নতুন পদ্ধতিতে
লেখারও একটা অন্যরকম দিক আছে। অর্পণা যখন আমার লেখাগুলো পড়ে শোনায়, বা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে, তখন যেন একটা নতুন চোখ
দিয়ে নিজের লেখাটাকে দেখতে পাই। ওর ভাবনাগুলোও আমার লেখার সাথে মিশে যায়। আর টাইপ
করার সময় অন্য যে সাহায্য করে, তার সাথেও একটা আদানপ্রদান
হয়।
তবে হ্যাঁ, আগের মতো অনর্গল লিখে যাওয়ার স্বাধীনতাটা আর নেই। লেখার গতি কমে গেছে।
কিন্তু লেখার ইচ্ছেটা কমেনি। যতদিন মাথায় ভাবনা আসবে, যতদিন
কলম ধরার শক্তি থাকবে, এইভাবেই লিখে যাব। যন্ত্রণা আছে,
কিন্তু তার চেয়েও বড় হল লেখার প্রতি ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাটাই
আমাকে চালিয়ে নিয়ে যায়।
আপনি বলেছেন যে
পাঞ্জাবী লেখায় রয়্যালটি নেই, আর বাংলায় পকেট থেকে
টাকা দিয়ে বই ছাপতে হয়। এই অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা পাঞ্জাবী ও বাংলা সাহিত্যের ওপর
কী প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?
এটা একটা বিরাট সমস্যা বাবা, শুধু পাঞ্জাবী বা বাংলার নয়, ভারতের অনেক আঞ্চলিক
ভাষারই এই অবস্থা। লেখার জন্য কোনও পয়সা নেই! পাঞ্জাবীতে তো রয়্যালটির ধারণাই নেই
প্রায়। লেখকরা নিজেদের আনন্দের জন্য লেখেন, তারপর হয়তো অনেক
কষ্টে একটা বই বের করেন। বাংলায় অবস্থাটা একটু অন্যরকম, সেখানে
নাকি পকেট থেকে টাকা দিয়ে বই ছাপতে হয়, তারপর সেটা বিলি করতে
হয় – কী ভয়ানক কথা!
এর প্রভাব তো মারাত্মক। প্রথমত, অনেক ভালো লেখক শুধু অর্থনৈতিক কারণে লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারেন না।
সংসার চালাতে হবে তো! শুধু মনের আনন্দে লিখে তো আর পেট ভরে না। ফলে অনেক প্রতিভা
হয়তো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, প্রকাশকরাও খুব
বেশি ঝুঁকি নিতে চান না। তারা শুধু পরিচিত বা বিখ্যাত লেখকদের বই ছাপতে আগ্রহী হন,
কারণ তাতে বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নতুন বা নিরীক্ষামূলক লেখার
সুযোগ কমে যায়। সাহিত্যের বৈচিত্র্য নষ্ট হয়।
তুলনায় ইংরেজি বা হিন্দিতে
অবস্থাটা কিছুটা ভালো। সেখানে পাঠকের সংখ্যা বেশি, বাজারটা বড়,
রয়্যালটির ব্যবস্থাও আছে। ফলে লেখকরা কিছুটা হলেও পেশাগতভাবে লেখার
কথা ভাবতে পারেন।
দিল্লিতে
শিল্পের গ্যালারির মতো এই এত বড় বাড়িটা কীভাবে তৈরি হল? আপনার লেখার আয় বা অন্য কোনও উৎস থেকে কি এটা সম্ভব হয়েছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও গল্প আছে?
এই বাড়িটা! হ্যাঁ, অনেকেই জিজ্ঞাসা করে। দেখে তো মনে হয় যেন একটা আস্ত আর্ট গ্যালারি! ঠিকই
ধরেছ বাবা। তবে এই বাড়িটা কিন্তু আমার টাকায় তৈরি হয়নি। আমার লেখার আয়? হেসে ফেলেন। সে তো আগেই বলেছি, পাঞ্জাবী বা বাংলা
লেখায় পয়সা কোথায়? আমরা তো মনের আনন্দে লিখি, বড়জোর পাঠকের ভালোবাসা পাই। তাতে আর যাই হোক, দিল্লিতে
এত বড় বাড়ি ওঠে না!
এই বাড়ি, এই দেওয়াল, এই ছাদ – এ সবকিছুর পেছনে আছে অর্পণা।
আমার মেয়ে, অর্পণা কৌর। তার তুলির টানে, তার রঙের দামে এই বাড়িটা তৈরি হয়েছে। ওর ছবি পৃথিবীর বড় বড় মিউজিয়ামে যায়,
অনেক দামে বিক্রি হয়। তুমি তো শুনেছই আমাদের কথায়, "It
sells very costly." সেই টাকাতেই একটু একটু করে এই জায়গাটা
তৈরি হয়েছে।
আমার স্বপ্ন ছিল, ওর জন্য এমন একটা জায়গা হবে যেখানে ও ওর বড় বড় ক্যানভাসগুলো নিয়ে
নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে। যেখানে ওর ছবিগুলো ঠিকমতো রাখা যাবে, আলো পাবে, বাতাস পাবে। শুধু ওর ছবি নয়, চেয়েছিলাম এটা যেন শিল্পীদের, লেখকদের, সঙ্গীতশিল্পীদের একটা আড্ডার জায়গা হয়ে ওঠে। আমাদের যে Academy of
Fine Arts and Literature, তার জন্যও তো একটা ঠিকানা দরকার ছিল। তাই
বাড়িটা যখন তৈরি হল, তখন সেভাবেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল –
কাজের জায়গা, থাকার জায়গা, আবার
শিল্পের চর্চা করারও জায়গা।
তবে কাজটা সহজ ছিল না। দিল্লিতে
বাড়ি তৈরি করা তো একটা যুদ্ধ জেতার মতো! কত অনুমতি, কত দৌড়াদৌড়ি,
কত বাধা! অনেক সময় লেগেছে, অনেক পরিশ্রম
হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন এটা তৈরি হল, তখন মনে হয়েছিল,
হ্যাঁ, একটা স্বপ্ন সত্যি হল। এটা শুধু
ইট-কাঠের বাড়ি নয় বাবা, এটা অর্পনার শিল্পের প্রতি আমার
ভালোবাসা, আর আমাদের দুজনের মিলিত স্বপ্নের একটা ঠিকানা।
আমার লেখার টাকায় নয়, এ বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আমার মেয়ের
প্রতিভার ওপর ভর করে। এটা বলতে আমার কোনও দ্বিধা নেই, বরং
গর্ব হয়।
অমৃতা প্রীতমের
সাথে আপনার বন্ধুত্ব এবং তাঁকে আপনার "নায়িকা" মনে করার পেছনের গল্পটা
খুব আকর্ষণীয়। তাঁর কোন গুণগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আপনাদের
সম্পর্ক কেমন ছিল?
অমৃতা! আহা, কী বলব ওর কথা! ও শুধু আমার বন্ধু ছিল না, ও ছিল
আমার অনুপ্রেরণা, আমার হিরোইন – ঠিকই শুনেছ। আমাদের পরিচয় তো
সেই ছোটবেলায়, লাহোরে। আমার বয়স যখন পাঁচ, ওর তখন ষোলো। ওর বাবা ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি খুব বড় হোমিওপ্যাথি
ডাক্তারও ছিলেন। অমৃতা তখন সদ্য বিবাহিতা, ওর টিবি হয়েছিল।
তখনকার দিনে টিবির কোনও ভালো চিকিৎসা ছিল না। ও আমার বাবার কাছে এসেছিল চিকিৎসার
জন্য। বাবা ওকে দু'বছরে সারিয়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই আমাদের
দুই পরিবারের মধ্যে একটা যোগাযোগ তৈরি হয়।
আমি ওকে প্রথম দেখি আর মুগ্ধ হয়ে
যাই! কী সুন্দর দেখতে ছিল ও! পাতলা ঠোঁট, টানা টানা ভুরু, দুধে আলতা গায়ের রঙ – তখনকার দিনে যাকে বলে আদর্শ সুন্দরী। কিন্তু শুধু
রূপ নয়, ওর ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। ওর চোখেমুখে একটা
বুদ্ধির দীপ্তি, একটা তেজন্বিতা ছিল।
ওর যে গুণটা আমাকে সবচেয়ে বেশি
টেনেছিল,
সেটা হল ওর সাহস। ও ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। পুরুষশাসিত সমাজে
দাঁড়িয়ে ও মেয়েদের কথা বলত, প্রেমের কথা লিখত নির্ভীকভাবে।
ওর বিখ্যাত কবিতা 'আজ আখা ওয়ারিস শাহ নু' – দেশভাগের সেই যন্ত্রণা, মেয়েদের সেই হাহাকার – আজও
গায়ে কাঁটা দেয়। ওর লেখায় যে আগুন ছিল, যে সততা ছিল, তা আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ও কখনও মিথ্যার সাথে আপোস করেনি,
সমাজের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি।
আমাদের সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্ব আর
শ্রদ্ধার। ও আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিল, অনেক অভিজ্ঞ ছিল। আমি ওর
থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আমরা একসাথে কত আড্ডা দিয়েছি, সাহিত্য
নিয়ে আলোচনা করেছি। ও 'নাগমণি' নামে
একটা পত্রিকা বের করত, আমিও লিখতাম তাতে। ওর স্পষ্টবাদিতা,
ওর স্বাধীনচেতা মনোভাব আমাকে সবসময় সাহস জুগিয়েছে। হ্যাঁ, ও পরে রাজ্যসভাও পেয়েছিল, কিন্তু ও কখনও ক্ষমতার
কাছে মাথা নত করেনি। অমৃতা ছিল এক সত্যিকার বিদ্রোহী আত্মা। ওর মতো মানুষ খুব কম
জন্মায় বাবা।
আপনি ইন্দিরা
গান্ধীকে তাঁর করা "সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ভুল"-এর কথা সরাসরি বলেছিলেন এবং
তাঁকে হরমন্দির সাহিবে গিয়ে ক্ষমা চাইতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এত বড় একজন রাজনৈতিক
ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো বলার সাহস কোথা থেকে পেয়েছিলেন? তাঁর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
হ্যাঁ বাবা, বলেছিলাম। একেবারে মুখের ওপর বলেছিলাম। সেটা ছিল অপারেশন ব্লু-স্টারের
পরের ঘটনা। আমি তখন ইমার্জেন্সির বিরুদ্ধে লেখার জন্য সরকারের চক্ষুশূল। কিন্তু
তার আগে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আমার বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি আমাকে ভারতীয়
মহিলাদের একটা ডিরেক্টরি তৈরির খুব কঠিন দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর সাথে
আমার প্রায়ই কথা হত, গভীর রাতেও তিনি ফোন করে কাজের খোঁজ
নিতেন।
কিন্তু যেদিন তিনি ইমার্জেন্সি
ঘোষণা করলেন, সেদিন থেকেই সব সম্পর্ক শেষ। আমি তাঁর বিরুদ্ধে
লিখলাম। তারপর ঘটল অপারেশন ব্লু-স্টার। শিখদের কাছে হরমন্দির সাহিব কতটা পবিত্র,
সেটা উনি বুঝলেন না। ওই ঘটনার পর শিখদের মনে যে গভীর ক্ষত তৈরি
হয়েছিল, তা আমি অনুভব করতে পারছিলাম।
এর কিছুদিন পর, মোহললালের মাধ্যমে কিছু শিখ বুদ্ধিজীবী আমার কাছে আসেন। তারা ইন্দিরা
গান্ধীর কাজের খুব প্রশংসা করছিলেন – "আপনি খুব ভালো করেছেন, ওই উগ্রপন্থীদের দমন করার দরকার ছিল," ইত্যাদি।
আমি চুপচাপ শুনছিলাম। তখন ইন্দিরা গান্ধী আমাকে বললেন, "অজিত জী, আপনি কিছু বলছেন না যে?"
তখন আমার ভেতরের রাগটা আর চেপে
রাখতে পারলাম না। আমি বললাম, "আমি কী বলব? আমি যা বলব, তা আপনার ভালো লাগবে না।" উনি
বললেন, "না, না, আপনি বলুন।" তখন আমি বললাম, "আপনি যা
করেছেন, তা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ভুল। এর থেকে
বাঁচার এখন একটাই রাস্তা – মাথায় সুন্দর করে দোপাট্টা দিয়ে, সালোয়ার-কামিজ
পরে হরমন্দির সাহিবে যান। হাত জোড় করে বলুন, 'আমার ভুল হয়ে
গেছে, আমাকে ক্ষমা করে দাও।' শিখরা
বোকা জাত, ওরা মাথা দিয়ে ভাবে না, ওরা
হৃদয় দিয়ে ভাবে। ওরা বলবে, 'এ তো আমাদেরই মেয়ে, ক্ষমা চাইতে এসেছে। ওকে ক্ষমা করে দাও।' আপনি ক্ষমা
পেয়ে যাবেন।"
সাহস কোথা থেকে পেয়েছিলাম? জানি না বাবা। হয়তো ভেতরের ক্ষোভ থেকে, সততার থেকে।
আমার মনে হয়েছিল, সত্যিটা বলা দরকার।
তাঁর প্রতিক্রিয়া? তিনি চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মুখে একটা শব্দও করেননি। কিন্তু
তাঁর মুখ দেখেই বুঝেছিলাম, আমার কথাগুলো তাঁর ভালো লাগেনি।
তিনি হয়তো বন্ধুত্ব পাতানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আমি সেই
সুযোগ দিইনি। আমার কাছে দেশের চেয়ে, মানুষের চেয়ে বড় আর কিছু
ছিল না, কোনও বন্ধুত্বও নয়।
আপনি জরুরী
অবস্থার বিরুদ্ধে লিখেছেন। সরাসরি আক্রমণ না করে সুররিয়ালিস্টিক ভঙ্গিতে লেখার
সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন? এটা কি আত্মরক্ষা ছিল, নাকি শৈল্পিক কৌশল?
জরুরী অবস্থা... সে ছিল এক
অন্ধকার সময়। মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিল না। চারদিকে ভয় আর আতঙ্ক। আমি তখন ইন্দিরা
গান্ধীর খুব ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যেই ছিলাম, ওই ডিরেক্টরির
কাজটার জন্য। কিন্তু যেদিন উনি ইমার্জেন্সি ঘোষণা করলেন, আমি
ঠিক করলাম, এর বিরুদ্ধে আমাকে লিখতেই হবে। লেখক হয়ে যদি এই
অন্যায়ের প্রতিবাদ না করি, তাহলে আমার লেখার দাম কী?
কিন্তু সরাসরি লেখারও উপায় ছিল
না। তাহলে তো সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হয়ে যেতাম, লেখাও বন্ধ হয়ে যেত। তাই
আমি একটু অন্য পথ নিলাম। আমি গল্প লিখলাম, কিন্তু সেগুলো ছিল
সুররিয়ালিস্টিক, অনেকটা গার্সিয়া মার্কেজের লেখার মতো।
সেখানে কোনও নির্দিষ্ট নাম ছিল না, কোনও ঘটনার সরাসরি উল্লেখ
ছিল না। কিন্তু যারা বুঝবার, তারা ঠিকই বুঝতে পারত আমি কী
বলতে চাইছি। রূপকের আড়ালে, ইঙ্গিতের ভাষায় আমি আসলে ওই সময়ের
দমবন্ধ করা পরিস্থিতি, ক্ষমতার আস্ফালন আর মানুষের অসহায়তার
কথাই বলছিলাম।
এটাকে তুমি আত্মরক্ষা বলতে পারো, আবার শৈল্পিক কৌশলও বলতে পারো। দুটোই সত্যি। একদিকে যেমন সরাসরি আক্রমণ
এড়িয়ে সেন্সরশিপের খাঁড়া থেকে বাঁচা যাচ্ছিল, অন্যদিকে তেমনি
লেখার মধ্যেও একটা অন্য মাত্রা আসছিল। সুররিয়ালিস্টিক ভঙ্গিতে লেখার ফলে বাস্তবতার
চেয়েও গভীরের সত্যিটা, সেই সময়ের আতঙ্ক আর অবাস্তবতা-টা হয়তো
আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা যাচ্ছিল।
একজন
অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে কলমের শক্তি এবং আইনি লড়াইয়ের মধ্যে কোনটিকে আপনি বেশি
কার্যকর মনে করেন?
হ্যাঁ বাবা, আমি অ্যাক্টিভিস্টও বটে! শুধু বইয়ের জগতে মুখ গুঁজে বসে থাকিনি। যখন
দেখেছি গাছ কাটা হচ্ছে নির্বিচারে, বা আমাদের পুরোনো কোনও
সৌধ নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে, তখন আমি চুপ করে থাকতে পারিনি।
আমি আদালতে গেছি। আমি নিজে উকিল নই, কিন্তু আমি উকিল নিয়োগ
করেছি । লড়াই করেছি।
আবার এটাও সত্যি যে, কলমের ওপর আমার বিশ্বাস সবচেয়ে বেশি। পয়সা দিয়ে উকিল কেনা যায়, বিচারকেও হয়তো প্রভাবিত করা যায়, কিন্তু কলমকে কেনা
যায় না। একজন সৎ লেখকের কলম সবসময় সত্যের পক্ষে কথা বলবে। যখন দেখি কোনও অন্যায়
হচ্ছে, তখন আমি আদালতে যাওয়ার পাশাপাশি কলম ধরি। লিখি খবরের
কাগজে, লিখি আমার বইয়ে। মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করি।
কোনটা বেশি কার্যকর – আইনি লড়াই
নাকি কলমের লড়াই? এটা বলা মুশকিল। দুটোই দরকারি, আর দুটোই একে অপরের পরিপূরক। আইনি লড়াইটা দরকার তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য,
কোনও অন্যায়কে থামানোর জন্য। আদালত একটা নির্দেশ দিলে গাছ কাটা বা
সৌধ ভাঙা হয়তো বন্ধ হয়। কিন্তু মানুষের মানসিকতা বদলায় না।
আর কলমের লড়াইটা হল সেই মানসিকতা
বদলানোর লড়াই। লেখা মানুষের মনে প্রভাব ফেলে, তাকে ভাবতে শেখায়,
তার মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে। এই পরিবর্তনটা হয়তো ধীরে ধীরে আসে,
কিন্তু এটা অনেক বেশি স্থায়ী হয়। লেখা পারে জনমত তৈরি করতে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারকে বা প্রশাসনকে সঠিক পথে চলতে বাধ্য করে।
তাই আমি বলব, দুটো লড়াইই জরুরি। যখন যেমন প্রয়োজন, তখন তেমন
অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। কখনও আদালতের আশ্রয় নিতে হবে, আবার
কখনও কলমকেই হাতিয়ার করতে হবে। তবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, কলমের
শক্তিটাই দীর্ঘমেয়াদী এবং অনেক বেশি গভীর। কারণ কলম শুধু অন্যায়কে থামায় না,
কলম মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। আর একবার যদি মানুষের বিবেক জেগে
ওঠে, তাহলে কোনও অন্যায়ই বেশিদিন টিকতে পারে না।
এত বছর ধরে
লেখার পর, এত সম্মান পাওয়ার পর , পদ্মশ্রী, সাহিত্য আকাদেমি ফেলোশিপ, আপনি বলেছেন আপনার আর কোনও ইচ্ছে নেই, আপনি এক
পরিপূর্ণ জীবন যাপন করেছেন। এই পরিপূর্ণতার অনুভূতিটা ঠিক কেমন?
হ্যাঁ বাবা, সত্যি কথাই বলেছি। এই নব্বই বছর বয়সে এসে আমার আর কোনও চাওয়া-পাওয়া নেই।
যা পেয়েছি, যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি
– তাতেই আমি পরিপূর্ণ। লাহোরের সেই দিনগুলো থেকে শুরু করে দেশভাগ, দিল্লি আসা, লেখালেখি, সংসার,
অ্যাক্টিভিজম, FOSWAL, দেশ-বিদেশে ঘোরা – জীবন
আমাকে দু'হাত ভরে দিয়েছে। অনেক কষ্ট পেয়েছি, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, কিন্তু ভালোবাসাও পেয়েছি প্রচুর।
সম্মান? হ্যাঁ, পদ্মশ্রী, আকাদেমি ফেলোশিপ – এগুলো পেয়েছি। কিন্তু এগুলো আমার কাছে পথের ধারের
মাইলস্টোনের মতো, গন্তব্য নয়।
পরিপূর্ণতার অনুভূতিটা কেমন? এটা ঠিক ভাষায় বোঝানো কঠিন। এটা অনেকটা শান্ত, স্থির
একটা পুকুরের মতো। যেখানে আর কোনও ঢেউ নেই, কোনও তোলপাড় নেই।
শুধু একটা গভীর শান্তি, একটা কৃতজ্ঞতাবোধ। যা করেছি, যা হতে পেরেছি – তার জন্য কোনও আফসোস নেই। মনে হয়, জীবনটাকে
তার সবটুকু রঙ আর রস দিয়ে যাপন করতে পেরেছি। এটাই আমার কাছে পরিপূর্ণতা। আমার যা
বলার ছিল, তা আমি আমার লেখার মধ্যে দিয়ে বলার চেষ্টা করেছি।
সততার সাথে বাঁচার চেষ্টা করেছি। এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? জ্ঞানপীঠ? ওসব নিয়ে আমি ভাবিই না। লোকে আকাদেমি
পুরস্কারের জন্য কেমন দৌড়াদৌড়ি করে, তদবির করে – দেখলে হাসি
পায়! আমার আকাদেমি পুরস্কার পাওয়ার খবর তো আমি টিভিতে দেখে জেনেছিলাম!
নতুন প্রজন্মের লেখকদের কি এমন
পরিপূর্ণতার আশা রাখা উচিত? কেন নয়? তবে
পরিপূর্ণতা মানে কিন্তু থেমে যাওয়া নয়। পরিপূর্ণতা মানে আত্মতুষ্টিও নয়। এটা হল
নিজের জীবন আর কাজ নিয়ে একটা শান্ত সমাহিত বোধ। এই অনুভূতিটা আসে দীর্ঘ পথচলার পর,
অনেক লড়াই আর অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে।
তরুণ লেখকদের বলব, তোমরা পরিপূর্ণতার 'আশা' করার
চেয়ে বরং সৎভাবে লেখা আর বাঁচার ওপর জোর দাও। জীবনকে তার সবটুকু দিয়ে অনুভব করো,
মানুষের জন্য লেখো, সত্যের জন্য লেখো।
পুরস্কার বা খ্যাতির পেছনে ছুটো না। নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকলে, জীবনকে ভালোবাসলে, পরিপূর্ণতা একদিন নিজেই তোমার
কাছে ধরা দেবে। তখন দেখবে, আর কোনও অপূর্ণতা নেই, কোনও অতৃপ্তি নেই। শুধু আছে এক গভীর শান্তি। সেই শান্তিটাই জীবনের সবচেয়ে
বড় পুরস্কার।
ধন্যবাদ লেখক , সাহিত্য একাডেমির সর্বোচ্চ সম্মান ফেলো অব সাহিত্য একাডেমি, পদ্মশ্রী বিজেতা অজিত কৌর সার্ক কান্ট্রির সাহিত্যিকদের আম্মা, আপনি আমাদের গর্ব । আমাকে ইন্টারভিউ দেবার জন্য ধন্যবাদ ।
দেখো বাবা, সম্মান, পুরস্কার – এগুলো তো আসে, যায়। আসল হল মানুষের ভালোবাসা, আর নিজের বিবেকের
কাছে পরিষ্কার থাকা। তোমরা যে আমাকে এত সম্মান দিচ্ছ, এত
ভালোবাসা দিচ্ছ, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। 'গর্ব' বোলো না বাবা, আমি তো
শুধু আমার মনের কথাগুলো, আমার সময়ের সাক্ষী হয়ে থেকেছি,
সেটাই লিখেছি।
তোমার মতো একজন তরুণ কবির সাথে
কথা বলতে পেরে আমারও খুব ভালো লেগেছে। এই দীর্ঘ আলাপচারিতা আমাকেও যেন নতুন করে
প্রাণ দিল। কত পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিলে তুমি! অনেক কথা বলে ফেললাম বাবা।
এই বুড়ো বয়সে এর বেশি আর কী-ই বা
বলতে পারি? তোমরা তরুণ, তোমাদের হাতেই
ভবিষ্যতের মশাল। সাহসের সাথে, সততার সাথে লিখে যাও। তোমাদের
জন্য আমার অনেক অনেক আশীর্বাদ রইল। অনেক অনেক ভালো থেকো। শুভকামনা রইল তোমার জন্য।