৩৩ ফুট্টা রোড



আরশি




দেখেছো পালাম পাপ্পানকালান ঐ রাইসিনা গাঁও
মস্তক থেকে কে কার ঘোমটা সরাবে


তেত্রিশ ফুটে হেঁটে যায় ফুটে ফুটে সোলাংকি তনয়া
এক ফুঁ হাওয়া দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া ওড়না

রাস্তার শেষে এক ঠাকুমা কিনছেন পান সুপারি,
তার আঙুলে লেগে থাকে কবিতার লবণ—
এই পথে হাঁটে তিনজন,
পায়চারি করে অসংখ্য ছায়া—

কেউ জাঠ, কেউ বা পূর্ববঙ্গ
এর ভিতর সীসা
এর ভিতর এক আরশি
দিল বালা দিল বালা দিল্লির ভেঙে যাওয়া সড়কে
রং থেকে , রূপ থেকে ঝরে যাওয়া
অপূর্ব সে এক সময় পালক ।
--------



বহিরাগত




নীল থেকে
মেঘ থেকে মুছে ফেলেছো তার ছায়া
আলতো আঁচড়ে নিয়েছো কপালের দখলদারি
এই সন্ধ্যায় রাস্তা হয়ে ওঠে খতিয়ান—

এপাশে আলু, ওপাশে সময় বিক্রি হয়
এক শিশু খড়ি দিয়ে ট্রেন আঁকে,
পায়ের তলায় মুছে ফেলে

কবিরা তর্ক করে অযথা এই বাঙালি পাড়ায়
নাগরিকতা মানে কি ভাষা নাকি ঋণ
যতকিছু হতে পারে ভোগ্য জায়গির জেনেও
এক পশলা বৃষ্টি স্বত্বেও এই পাড়ায়
কুসুম কুসুম ডিম এই ভোরবেলা
দুয়ারপ্রদেশে তবু লিখে রাখা হবে 
বহিরাগত ।



-----------


দিলবালে




এই নেই, এই আছি , এই আমাদের পাখি
দানায় দানায় লেখা আছে যেথা চঞ্চুচিহ্নমালা
চকচকে ক্ষুধার কাছে এই আঁখি,
এই সমর্পণ
তেত্রিশ ফুটায় দাপিয়ে বেড়ানো পদ্য সমূহে
লিখে ফেলা তিন পাতা রোমহর্ষক


অক্ষরের আর্তি আছে , এই আছি, এই পায়রা
দিল্লি দিলবালে কা,
কা কা খা খা আবর্ণ উড়িয়ে দেওয়া জাঠ যুবকের
বাইকের ধুলোয় অস্বচ্ছ চোদ্দ ডেসিবল


সজোরে পড়ার আছে কত যে পংক্তিমালা
এই আমাদের চড়ুই,
এই আমাদের ভাতি
দূর প্রদেশ থেকে অলক্ষ্যে উড়ে আসা কাক
ঠিকানায় কেয়ার অফ প্রাণজি বসাক ।


----------




কৃষ্ণকলি




ফেটে গেলো ৩৩ ফুট
চৌচির চৌত্রিশে এখনো বাগিচায় গেন্দা হলুদ
ঘটনা ফুটে আছে জনজুথিকা জুড়ে

চিত চিত দৌড় মানে চিতাবাঘ নয়
এমনিই মারীচ মারীচ বলে দৌড়ে ছুটে যাই
হে বাচিক, পশ্চিম কখনো একা বঙ্গ হয় না
দিক ভ্রষ্ট হালদারের মাছের দোকানে
এই মাঘে খবর হয়ে গেছে
দেহ সর্বসব বহু কবিতার প্রবাস ফুটে আছে
জুলাই আগস্টের ম্যাংগো শেক নিয়ে
দু কথা বলুন হে শিথিল প্রণব দত্ত ।

এদেশ আমার না
ক্ষুধাপ্রান্তে কুড়িয়ে নিয়েছে পরিযায় জেনো
পরিযায়ী তুমিও, পরিযায়ী আমিও
নাতি দীর্ঘ ৩৩ ফুট্টায় আমাদের পদযুগলের
গভীর কৃষ্ণকলি ফুটে আছে ।

--------


ছোট কবি, বড় কবি

বিশ্বাস মোবাইলে পেতে রাখি
একখানি তাকাতে না চাওয়া ব্যালকনি
কাঁচুলি খুলে দিলেই উড়বে অক্ষরমালা
এমনই ফুলের ব্যাকরণের পাতা
যেখানে গোলাপ হলুদ, জুঁই হলুদ
অজানা হলুদ 

গরমাগরম চায়ের ভাণ্ডারে সেজে ওঠা

ছোট কবি, বড় কবি, মাঝারি অমলতাস

হেঁটে চলি পাশাপাশি
পথ জুড়ে বেজে ওঠে দশকের ব্যাবধান
গ্রামাফোনে বাজে পুরানো কবিতার গুহ্য
ডাক্তারবাবুর হাসি, মুদিখানার ভিড়
এরাই তো পদ্যের শরীর, শব্দের গভীর আহ্বান
৩৩ ফুট মানে এক জীবন্ত কবিতা,
হলুদ গাঁদার গন্ধে মাখা,
বাঙালিয়ানার নীরব অভিমান।

--------


ইশতেহার

অলক্ষে নেমে আসে সন্ধ্যা,
যেন এক ক্লান্ত ঘুড়ি
পাশের চায়ের দোকানে
স্নান সেরে গরম তেলে ভেজে উঠছে আলু চপ,

ভোটের মিটিংএ ডুবে আছে কালিবাড়ি
মনমোহন রোডের ঝাঁঝালো হারিয়ানভি বক্তৃতায় ।

জাঠ যুবকেরা জ্বলে ওঠে
জ্বালিয়ে দেয় কলোনির যাপন অস্থিরতা
আমরা খুঁজি শব্দের মুক্তি, ব্যঞ্জনের অন্তমিল
গলিতে জমে থাকে জীবনের অঙ্ক
কোথাও বাচ্চার কান্না,
কোথাও মোবাইলের দোকানে নতুন সুর।

আমাদের পদ্যের খাতায় ধুলোমাখা শরীর
বহু দূর থেকে আসা পরিযায়ী পাখির মতো এই পথ
কেউ খোঁজে আশ্রয়, কেউ খোঁজে পরিচিত গন্ধ
আমরা শুধু পরিত্যক্ত বাঙালী,
যারা বুনে চলি জীবনের কোলাজ,
দুপাতা পদ্যসহ লিখে চলা প্রেমের ইশতেহার ।


--------


সাক্ষী

এ শুধু ভৌগোলিক নয় , এ এক মানচিত্র
হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির আর না বলা কথার
মহাবীর এনক্লেভের প্রতিটি ইঁটের গায়ে

বাঙালিয়ানার ঘ্রাণ নিয়ে প্রবীন কবি
লিখে চলেছেন তার প্রেমের কবিতা

বিরহের সুর নিয়ে গুনে নেওয়া মৃত্যুর ঠিকানা
ক্ষুধার্ত চোখে তার বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
তেত্রিশ ফুট, যেন এক জটিল গণিত ।

এই গলির ভূগোলে জাঠভূমির উষ্ণ আলিঙ্গন
তবু যেন কোথাও কাশফুল ফোটে হেমন্তের দুপুরে,
আর শিউলি ঝরে হেমন্ত সন্ধ্যায়
তরুণ কবি বলে ওঠে, কবিতা মানে মুক্তি,

প্রেমের আহ্বানে উদ্দত নির্ভিক পদযুগল
নীরবে সাক্ষী হয়ে জেগে থাকা

মধ্য রাতের তেত্রিশ ফুট্টা রোড ।

----------


সংলাপ

হালদারের দোকানে পচে ওঠা তরকারির গন্ধ
মনুময় কাফের মধ্যহ্নে ভেজে রাখা চাউমিন

আর মোবাইলের দোকানে কিশোরীদের ভীড়

জাঠ যুবকের বাইকের আওয়াজ,
এরাই তো ভাষার বীজ, শব্দের বাসভূমি
যেন এক না-শেষ হওয়া সংলাপ
কবি খোঁজে শব্দের কারুকাজ, অলঙ্কারের ছটা,
আমি খুঁজি মাটি, গন্ধ মেলাই গণিতের
চুপ থাকি তারপর।

কবি লেখে রূপকের কবিতা, উপমার খেলা,
বৃথাই খুঁজেছি এতোকাল
যাকে আবৃত্তির আসরে

এরা এতো শব্দ করে কেন অকারণ

দত্ত প্রণবের বাচিক অভিনয় এক জাদুটোনা,
আর হালদারের মাছের দোকানের হাঁকডাক
ছন্দ বিচার নিয়ে
কেমন যেন আগুন লাগে মুদির দোকানে

টাঙানো রঙিন বিজ্ঞাপন
জাঠ শিশুর দৌড়ে শুনতে এক নতুনের ভাষা
আর লাল চা খেয়ে উঠে যাওয়া বৃদ্ধের
আর্ধেক ভেঙে যাওয়া লাঠির ঠকঠক ।

----------


খাদ্য খাদক

এই শহরে কে আর কবিতা শুনতে চায়
রাস্ক বিস্কুটের সঙ্গে কবি চা পানেই খুশী
মধ্যরাতে সজোরে মদখেয়ে নাড়িয়ে দিতে চায়
জেগে থাকা ছাতিমের ডাল
এই রাস্তা তবু কাঁপে না, শুধু ভেঙে যায়—
তেড়ে ফুটে ওঠে লাল বিজ্ঞাপনের ভূত ।

পেট বরাবার বুঝি কারো গতিময় বেগ
ছুটে যাওয়া মারুতীর ধূলোয় সরে বসে
৩৩ ফুটে সাজিয়ে রাখা খাদ্য খাদক ।

বাঙালির দোকানে আলুর দাম বাড়ে,
আর এক কবি বলেন,

দরকার কি?
ক্ষুধা তো শব্দহীন, শুধু অক্ষরের ভিড়—
এক কাপ চায়ে ডুবে আছে পুরনো জমিন।

----------

ক্ষুধার পালক

ভোরবেলা এক কাক ঠোঁটে নিয়ে যায়
এক টুকরো রুটি—
সেই রুটির গায়ে লেখা পরিযায়
প্রবীন কবি বলেন, এটা কোনো কবিতা নয়,
এটা শুধু ক্ষুধার পালক ।

দোকানের শেডে ঝুলছে ভোডাফোনের বিজ্ঞাপন,
তার ভেতর থেকে ফিসফিস করে মাছ—
গঙ্গা এখানে নেই, তবু আজ জাল টানা যাক
এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে নদীর ছায়া।

তরুন কবি চায়ের দোকানে বসে

দুচুসকি অদ্রক চা চুমুক দিয়ে
লিখে ফেলেন আকাশের ঠিকানা—
পশ্চিমে বঙ্গ নেই, আছে শুধু হেঁটে যাওয়া
আর একটি রাস্তা,

যে কখনো শেষ হয় না।

------------

ঠিকানা

ফুটপাথে এক কুকুর শুয়ে আছে,
তার পাশে বাঁধা লাল গেরুয়া রং—
এক কবি বলেন, এটা রক্ত নয়,
এটা শুধু আর এক সংগ্রামী পদচারণা নয়

প্রভাত আনতে চাওয়া একটি সামান্য পতাকা

ত্রুপতি মোবাইল দোকানের সামনে
ফেসবুকে অযথা যুবক রিলস স্ক্রোল করে যায়—


রাস্তা শেষ হয় না আর,



এই পিক্সেলগুলো কি কবিতা?
নাকি শুধু ভুল দেশের ছায়া?
স্বপ্ন তার ভেঙে যায় চৌত্রিশ টুকরো কবিতায়—

এখানে বাঙালি, জাঠ, কবি, কুকুর ও কাক—
সবাই একসাথে হাঁটে ৩৩ ফুট্টায়
কিন্তু কেউ কারো ঠিকানা জানে না।

----------


মাছ

নদী মানে একা তো যমুনা নয়

একটি মাছ রোডের ড্রেনে বেঁচে আছে—
সে বলে, নদী এখান থেকেই শুরু হয়

বিশ্বাস নামে এইখানে

গঙ্গার একটি শাখা নদী আছে

আর আছে তার অর্ধশুদ্ধ উচ্চারণ
কবিরা শুনে হাসে,
আর এক ফেরিওয়ালা কাঁধে নিয়ে যায়
গৃহস্থের বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা আনন্দবাজার ।

দুপুরে রোদ যখন রাস্তাকে ভাজ করে,
এক বৃদ্ধা বলেন, এই তপ্ত অ্যাসফল্টে
লেখা আছে আমার শৈশবের ঠিকানা
এইখানে নদী ছিল,

এখন শুধু পাইপের গুঞ্জন।

মাছটি ডিগবাজি দেয়,
আর কবির দাগটানা খাতায় জমা হয়
অদৃশ্য নদীর সাক্ষর ।

----------

চা

চায়ের দোকানের কাপে ভাসে এক চিলতে বঙ্গ—
প্রবীন কবি বলেন, এই ফেনাই আমার মাতৃভূমি
দুগ্ধ-সাদা, ক্ষণস্থায়ী,
যেখানে ডুবে আছে পূর্ব পশ্চিম
আর অনেকগুলো বিস্মৃত ডাকনাম।

পাশের টেবিলে এক যুবক মুঠোফোনে
খুঁজে ফেরে কলকাতার আবহাওয়া—
এখানে কি বৃষ্টি নামবে?
দোকানদার হেসে বলেন, বৃষ্টি নয়,
এই তো শীশা আর সালফার

বায়ুদুষণ নিয়ে আমাদের আড্ডা

চিনি-কম চায়ে তুফানী ঝড় ওঠে।

মধ্যরাতের ইশারায় আজ বিকেলে অকস্মাৎ বারিশ
চা ঠান্ডা হয়ে যায়,
কবিতা হতে থাকে গরম থেকে গরমতর।

-------------


স্মৃতিপদ্ম

এখানে ফুটপাথে পুড়ে যায় স্মৃতিপদ্ম—
এক কবি বলেন, এইটাই আমাদের গঙ্গা
রাস্তার ধারে এক বালক
মোবাইলে সার্চ করে মন্দারমনির সৈকত,
স্ক্রিনে ঘিরে আসে শুধু ধূলোর ম্যাপ ।

দোকানের শেডে ঝোলে শুকনো মাছ,
তার গায়ে লেখা "মা-এর হাতের স্বাদ"—
কিন্তু লবণ তো এখানে মিথ্যে বলে,
কারণ এই নোনতা জিভেতে
কবিতার স্মৃতি বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না ।

রাত নামলে রাস্তায় সারি সারি ল্যাম্পপোস্ট,
নিয়ন লাইট জাদুকরের মতো জ্বলে ওঠে
মোবাইল স্ক্রিনে শুভ্র ললনার নীলাভ ছবি
রাত নামলেই এই আমাদের গঙ্গার ঘাট,
বেশী তাতে আলো হয় না,

শুধু আমাদের পদযুগলে তার স্মৃতি পুড়ে যায় ।


----------

টোটোওয়ালা
এই রোক্কে, টোটোওয়ালা
তুমি কোন দিকে যাচ্ছো
আমাদের কি নিজস্ব গন্তব্যে পৌঁছে দেবে
আমাদের কাছে কিন্তু পয়সা নেই ?

টোটোওয়ালা থেমে আছে
সঙ্গে তার তিনটে চাকা
একটি জাঠ যুবকের,
একটি বাঙালি কবির,
একটি অদৃশ্য শিশুর
যে রাস্তায় খেলতে আসে না।

কবিরা তর্ক করেন কবিতা কি
রাস্তার দৈর্ঘ্য নাকি সময়ের ফাঁক?

টোটোওয়ালা কিন্তু কোথাও চলে যায় না,
৩৩ ফুট্টা বরাবর
শুধু ঘুরতে থাকে
একটি চৌমাথা শেষ করে
আর একটি অসমাপ্ত চৌমাথায়।



------------




টিনের ছাদ

মাছের দোকানের টিনের ছাদ
এক কবি খুঁজে ফেরেন দীঘার বৃষ্টি —
এইটুকুই কি আমার বর্ষাকাল

পাশের দোকানে এক কিশোরী
মঞ্জুষা ভ্যারাইটিস

লিপস্টিক টেস্ট করে,
তার ঠোঁটে জমে থাকে
অনেক দূর প্রদেশের একটি নদীর নাম।

রাস্তায় হঠাৎ বৃষ্টি নামে,
টিনের ছাদে শব্দ হয়
ঠিক যেন রুপনারয়নের ঢেউ—

কিশোরী কান পেতে শোনে দীঘার গর্জন
কিন্তু কবি জানেন,
এটা শুধু দিল্লির উড়ে আসা ধূলিসর্বস্ব
আর সামান্য বুন্দাবান্দিতে
শুধু একটু ভিজে যাচ্ছে ।



-------------



দ্বিতীয় প্রহরের ছায়ালিপি




দোকানের শেডের নিচে ঝুলছে
শুকনো মাছের গায়ে লেখা চাঁদপুর
রত্না বৌদি এসেছেন পান চিবুতে চিবুতে
তার ঠোঁটে যেন লাল হয়ে ফোটে
দূর কোনো বঙ্গভূমির জেলার নাম । 

রোদের তাপে গলতে থাকে প্লাস্টিকের থলে
আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে
অচিন পাখির পালক
যার চোখে প্রতিফলিত হয় ভাঙা চেয়ার গান,
যার মুখে লেগে আছে শাল পিয়াল
আর রাস্তার শেষ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা

মিউনিসিপালিটির পোস্টারে যেন তার প্রতিমূর্তি
বাঘের চোখে জ্বলছে দুটো ট্রাফিক লাইট।


--------------


অর্ধরাত্রির নথিপত্র


রাত যত গভীর হয়
ততই রাস্তার ইটগুলো নরম হয়ে ওঠে
আর সেগুলোর ফাঁক দিয়ে সবুজ ফার্ণ জলহাই তুলছে
এমন ঘাস যার ডগায় জমে আছে বহিরগাছির শিশির,
দূর থেকে আসে বাইকের শব্দ
যেন কোনো অদৃশ্য নদীর স্রোত
আর কবির খাতার পাতায় আপনা থেকেই
লিখে যাওয়া শব্দগুলো
'স্টপ', 'লুক' , 'গো'


আলো ফোটার আগেই
সেইসব পথিকেরা ঘরে ফিরে গেছে
তাদের জুতোর তলায় আটকে থাকা 
মাটির গন্ধ নিয়ে।


------------------


রাস্তা

এই রাস্তারও একটা কান আছে,
পেতে রাখে এই পদচ্ছাপের উপরে ।
কারও পায়ে বাংলা, কারও হরিয়ানা।
ভাঙাচোরা পিচ, ধুলোর আস্তরণ
ভাঙ্গা দেওয়ালে উচ্চারিত হয় 
এই সব শুনে বুঝে
রাস্তা তার উত্তর লিখে রাখে।

তেত্রিশ ফুট শুধু রাস্তা নয়, 
একটা উচ্চারিত কবিতা —
সকাল শুরু মাছের দরদামে,
দুপুর কাটে বাইকের গর্জনে,
আর সন্ধ্যা ডোবে কালীবাড়ির ঘণ্টার শব্দে।

আমাদের ভাড়াটে অস্তিত্ব 
আর জাঠ গুজ্জরের মাটির অধিকার—
দুটোকেই নীরবে পাঠ করে,
পুরোনো বাড়ি কানাচে ভেরেন্ডা পাতায়
রাস্তা ভরে তোলে তার ধুসর ডায়েরী ।

----------------


অপর

ওদের চোখে আমরা জলছবি হয়ে আছি,
সহজেই মিলিয়ে যাবো, 
আবার ফুটে উঠি প্রয়োজনে
আমাদের ভাষা ওদের কাছে বিদেশি সুর,
যেন ভুল করে বেজে ওঠা কোনো রেডিয়ো স্টেশন।

তেত্রিশ ফুটের এই পরিসরে
আমরা সাজিয়ে রাখি আমাদের ছোট্ট বঙ্গ—
ব্যালকনিতে শুকোনো বড়ি, 
জানলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত,
আর মনে পুষে রাখা এক রাশ অভিমান।

ওরা যখন বলে "বাঙ্গালি বাবু",
তার মধ্যে স্নেহ থাকে, নাকি শুধু দূরত্ব—
এই অঙ্ক কষতে কষতেই
ফুরিয়ে যায় আরও একটা প্রবাসী দুপুর।

------------

ঘ্রাণ ও কোলাহল

এখানে বাতাসে ভাসে অনেক রকম ঘ্রাণ—
সর্ষের তেলে ভাজা মাছ, ধূপের গন্ধ,
পাশের বাড়ির রান্না করা রাজমা,
আর জাঠ যুবকের পারফিউমের 
তীব্র আস্ফালন।

শব্দেরাও খুঁজে চলেছে উত্তরসূরী —
হিন্দি গানের সুরে বাচ্চার কান্না,
মোবাইলের দোকানে নতুন রিংটোন,
আর মাঝরাতে ফিরে আসা কোনো কবির
দীর্ঘশ্বাসের শব্দ।

এই ঘ্রাণ আর কোলাহলের জঙ্গলে
যেন এক অদ্ভুত অর্কেস্ট্রা,
যেখানে শব্দই আত্মা
আত্মাই যেন তার সুরধ্বনি
যেখানে বেসুরোটাই বড় বেশি আপন।

----------

সময়রেখা

মজুমদার কাকু চশমার কাঁচ মুছে
দেখেন তাঁর ফেলে আসা গ্রাম,
আর ওই কোণের দোকানের ছেলেটা
মোবাইলের স্ক্রিনে দেখছে  রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ ।

একই তেত্রিশ ফুট, কিন্তু দুজনের কাছে
তার মানে দুটো ভিন্ন গ্রহ।
একজনের কাছে এই পথ মানে শেকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণা,
অন্যজনের কাছে রোজগারের রাজপথ।

সময় এখানে দুটো সমান্তরাল রেখায় হাঁটে—
একটাতে লেগে থাকে পুরোনো চালতার আচার,
অন্যটাতে ঝরে পড়ে গতির ধুলো ।
শুধু মাঝেমধ্যে উড়োজাহাজের শব্দে
দুটো রেখাই একত্রে আকাশের দিকে তাকায়।

--------------

বাঙালিপনা

পুজোর চাঁদার খাতা হাতে ঘুরছে পাড়ার ছেলেরা,
হালদারের দোকানে ইলিশ এসেছে কি না, 
বাবুলালের চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে—
বাংলা না দিল্লি, কে বেশি আপন?

এক চায়ে দেনা, কড়ক চায়ে
আমরা বাঁচিয়ে রাখি  আড্ডার আসর 
যেন এক ভিন্ন দেশে দূতাবাস খুলে বসেছি,
যার জাতীয় সঙ্গীত বাজে আমাদের বুকের ভেতর।

তেত্রিশ ফুটের এই নির্বাসনে
আমাদের বাঙালিপনা কালীপুজো দুর্গাপুজো ,
হিন্দি গানের হুক্কাবারে বিসর্জনের ঢাক
যমুনার জলেও তবু  
যা পুরোপুরি ধুয়ে মুছে যায় না ।


-------

জাঠভূমি

ওদের শরীর জুড়ে মাটির গন্ধ,
ট্যাটু আঁকা হাতে বাইকের হ্যান্ডেল—
যেন এই রুক্ষ জমিনের উত্তাপ
ওদের রক্তে মিশে আছে।

আমাদের বইয়ের তাক, কবিতার খাতা
ওদের কাছে হয়তো অর্থহীন বিলাসিতা।
ওদের কাছে জীবন মানে রক্ত পেশি
এই তেত্রিশ ফুট ওদের খেলার মাঠ।

আমরা যখন কাঁপা কাঁপা হাতে ভবিষ্যৎ খুঁজি,
ওরা সজোরে হেসে উড়িয়ে দেয় বর্তমান।
এই মাটি ওদের নাভি, আমাদের আশ্রয়—
এই সত্যটা মেনে নিতেই কেটে যায় অর্ধেক জীবন।

--------------


সন্ধ্যার পর

দিনভর যে রাস্তাটা ছিল রণক্ষেত্র,
রাত নামলে সে-ই হয়ে ওঠে 
এক বিষণ্ণ সন্ন্যাসী।
সোডিয়াম আলোর হলদে মায়ায়
ব্যালকনিতে ঝিমোনো শাড়ি 
আরও একা হয়ে যায়।

দূরের কোনো বাড়ি থেকে 
ভেসে আসে ঝগড়ার আওয়াজ,
পাশের ফ্ল্যাট থেকে বাচ্চার পড়ার সুর—
সবকিছু মিলেমিশে একাকার।
মাথার ওপর দিয়ে যখন প্লেন উড়ে যায়,
হঠাৎ মনে পড়ে, 
বাড়িটা আসলে কত দূর!

এই তেত্রিশ ফুট তখন আর রাস্তা থাকে না,
হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস—
যা মিলিয়ে যায় দিল্লির বিশাল রাতের আকাশে।

--------------


স্মৃতির মানচিত্র

এখানকার জলের পাম্পটা দেখলে
মনে পড়ে যায় গ্রামের টিউবওয়েল।
ধুলোমাখা বিকেলে হঠাৎ নাকে আসে
বর্ষার কদম ফুলের গন্ধ।
কবি এখানে শব্দ খুঁজে বেড়ায়—
সবজিওয়ালার হাঁকে, 
মুদির দোকানের বাকি খাতায়,
মনুময় কাফের তেলচিটে টেবিলে,
আর কালিবাড়ির পুরোহিতের মন্ত্রে।

কবিতা তো আর আকাশ থেকে পড়ে না,
কবিতা জন্মায় এই ভাঙাচোরা পথে।
জাঠ যুবকের বাইকের ধুলোয় মিশে থাকে উপমা,
বৃদ্ধের ভাঙা লাঠির ঠকঠক শব্দে লুকিয়ে থাকে ছন্দ।

তেত্রিশ ফুটের এই জীবন্ত কোলাহল থেকে
শব্দ কুড়িয়ে ফিরি প্রতিদিন,
তারপর নিজের একলা ঘরে সুগন্ধী বাসমতি
তাদের গায়ে মাখিয়ে দিই প্রবাসের  নুন ।

-----------------


ঠিকানা

আমাদের সন্তানেরা যখন কথা বলে,
তাদের মুখে বাংলা আর হিন্দি 
হিন্দি আর পাঞ্জাবী ।
ওরা কালীবাড়িতেও যায়, আবার হোলিতেও মাতে—
ওদের কাছে 'অপর' বলে কিছু নেই।

ওদের শেকড় কি এই তেত্রিশ ফুটের
ভাঙা পিচের গভীরে গেঁথে যাবে?
ওরা কি আমাদের মতো পরিযায়ী হবে,
নাকি এই মাটিকে নিজের বলে চিনবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নেই,
আছে শুধু এক চলমান বর্তমান।
পুরোনো ঠিকানার চিঠিগুলো আলমারিতে তোলা থাকে,
আর নতুন মানচিত্রে লেখা হতে থাকে
এক অদ্ভুত, মায়াবী ঠিকানা।

-----------------


আকাশচিহ্ন

মাথার ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ যায়—
যেন এক ধাতব পাখি, 
আমাদের ফেলে আসা ঠিকানাকে
আকাশের গায়ে লিখে দিয়ে মুছে দেয়।

তার ছায়াটা এক মুহূর্তের জন্য
তেত্রিশ ফুটের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়,
হালদারের মাছের ঝুড়ি, 
ভোলা বাবুর চায়ের কেটলি,
আর আমার কবিতার খাতা ছুঁয়ে।

আমরা সবাই মুখ তুলে তাকাই—
জাঠ যুবক, বাঙালি মাসিমা, খেলতে থাকা শিশু।
ঐ শব্দের গর্জনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য
আমরা সবাই শুধু দিল্লির বাসিন্দা,
আমাদের কোনো পূর্ববঙ্গ বা হরিয়ানা থাকে না।
শুধু থাকে এক আকাশ পরিমাণ দূরত্ব।

---------------

জলছাপ

এখানকার জলের স্বাদ অন্যরকম,
কেমন যেন ধাতব, অচেনা।
আমাদের জিভে এখনো লেগে আছে
পদ্মার জল, ইছামতীর ঘোলাটে স্মৃতি।

প্রতিদিন সকালে ট্যাঙ্কের জল যখন পড়ে,
তার শব্দে মিশে থাকে এক প্রকার নির্বাসন।
এই জলে সেদ্ধ হয় এখানকার চাল,
এই জলে ধুয়ে যায় আমাদের ক্লান্তি, 
আমাদের অভিমান।

আমরা এই জল পান করে করে
হয়তো একদিন এই শহরের মতো হয়ে যাবো।
শুধু বুকের গভীরে 
কোথাও একটা জলছাপ থেকে যাবে—
পুরোনো পুকুরঘাটের, প্রথম বৃষ্টির, মায়ের হাতের
সে ছাপ কখনো শুকায় না।

---------------

দেয়াললিখন

এই কলোনির দেয়ালগুলো কথা বলতে জানে না,
কিন্তু তাদের গায়ে লেখা থাকে অনেক ইতিহাস।
ভোটের পোস্টার, টিউশনির বিজ্ঞাপন,
শিশুর আঁকা হিজিবিজি—
একটার ওপর আরেকটার প্রলেপ।

কোথাও ইঁটের ফাঁকে উঁকি মারে অশ্বত্থ চারা,
যেন এই কংক্রিটের শরীরেও প্রাণের জিদ।

পুরোনো স্মৃতির ওপর নতুন দিনের প্রলেপ পড়ে,
তবু কোনো কোনো ফাটল দিয়ে
ঠিক উঁকি মারে ফেলে আসা গ্রাম, হারিয়ে যাওয়া মুখ।
তেত্রিশ ফুট সেই দেয়াল জুড়ে বয়ে চলা 
এক দীর্ঘ ফাটল।

--------------

মধ্যরাত্রির কুকুর

রাত যখন গভীর হয়,
বাইকের গর্জন থেমে যায়, দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়—
তখন তেত্রিশ ফুটের মালিক হয় ওরা।
কয়েকটা রাস্তার কুকুর।

ওদের চোখেও কি আমাদের মতোই এক বিচ্ছিন্নতা?
ওরাও কি এই মাটির, অথচ ঠিক যেন নয়?
ওরা ঘ্রাণ নেয় প্রতিটি দরজার, প্রতিটি চাকার,
ওদের নীরব হাঁটাচলায় লেখা থাকে 
এই পাড়ার গোপন ভূগোল।

আমি ব্যালকনি থেকে দেখি—
ওরা চাঁদের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে।
সেই ডাক কি খিদে, নাকি একাকিত্বের?
কে জানে! হয়তো ওরাও আমাদের মতো
এই ভাড়া করা আশ্রয়ে এক ধরনের 
বহিরাগত।

----------------------


শব্দজন্ম

আমার ছেলে যখন কথা বলে,
'জল' বলতে গিয়ে বলে ফেলে 'পানি',
'মাছ'-এর সাথে মিশিয়ে দেয় 'মছলি'।
তার মুখে বাংলা ভাষা এক নতুন রূপ নেয়,
যেন যমুনার তীরে গঙ্গার পলিমাটি।

তেত্রিশ ফুটের এই গলিতে
শব্দেরা রোজ জন্মায় আর মরে যায়।
হরিয়ানভি টানের সাথে মিশে যায় 
আমাদের নরম স্বরবর্ণ।
আমি ভয় পাই, 
একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে শুদ্ধ বাংলা,
আবার ভাবি, 
এভাবেই হয়তো তৈরি হয় নতুন ভাষা,
নতুন পরিচয়।
যা আমাদেরও নয়, 
ওদেরও নয়—শুধু এই রাস্তার নাম
থেকে যাবে তেত্তিস ফুট্টা ।

-------------


রন্ধনশালা

বাইরে জাঠভূমির রুক্ষতা, ধুলো, আর দ্বিধার বেড়া,
কিন্তু রান্নাঘরের চার দেওয়াল—সে আমাদের দুর্গ।
সেখানে সর্ষের তেলের ঘ্রাণে জেগে ওঠে বঙ্গভূমি
পোস্ত বাটার শব্দে মনে হয়, 
আমরা এখনো নিজেদের ঘরেই আছি।

পাশের ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসে হিং আর ঘিয়ের গন্ধ,
আমাদের কড়াইয়ে ফোটে পাঁচফোড়ন।
এই ঘ্রাণগুলোই আমাদের অদৃশ্য সীমানা,
যা দিয়ে আমরা এই বিশাল শহরে
নিজেদের এক টুকরো মানচিত্র এঁকে রাখি।
তেত্রিশ ফুট সেই দুই রান্নাঘরের মাঝখানের 
এক নো-ম্যান'স ল্যান্ড।

------------



ভাড়াটে ঈশ্বর

আমাদের ঠাকুরঘরগুলোও 
আমাদের মতোই ভাড়াটে।
ছোট্ট একটা তাকে, কিংবা দেয়ালের এক কোণে
ছবিতে বা মূর্তিতে তাঁরা চুপ করে বসে থাকেন।
তাঁরাও কি আমাদের সাথে পরিযায়ী হয়ে এসেছেন?

সকালে ধূপের গন্ধ যখন গলির বাতাসে মেশে,
তখন কি তা পাশের বাড়ির ভজনের সাথে ঝগড়া করে,
নাকি বন্ধুত্ব?
ঈশ্বরও এখানে হয়তো দ্বিধায় ভোগেন—
তিনি কি কালীবাড়ির, নাকি ওই মন্দিরের?
নাকি তিনিও আমাদের মতো,
এই তেত্রিশ ফুটের এক অস্থায়ী বাসিন্দা মাত্র?

--------------



ছায়াপথ

বিকেলের দিকে তেত্রিশ ফুটের ওপর
ছায়াগুলো লম্বা হতে থাকে।
আমার ছায়ার সাথে মিশে যায় 
মনুময় কাফের ছায়া,
একটা উড়ন্ত কাকের ছায়া,
আর বাইক নিয়ে ছুটে যাওয়া ছেলেটার ছায়া।

কিছুক্ষণের জন্য আমরা সবাই এক হয়ে যাই—
এই ছায়াপথে কোনো ভেদাভেদ থাকে না,
থাকে না কোনো ভাষা বা প্রদেশের দেওয়াল।
শুধু থাকে একটা চলন্ত কোলাজ,
যা নিঃশব্দে এঁকে চলে 
এই রাস্তার ভাঙাচোরা বুকে।
সূর্য ডুবলেই সে ছবি মিলিয়ে যায়,
আমরা আবার হয়ে যাই আলাদা, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

--------------


তৃতীয় প্রজন্ম

যে শিশুটা আজ জন্মালো ডাক্তারবাবুর নার্সিংহোমে,
তার কাছে তেত্রিশ ফুট মানেই পৃথিবী।
তার কাছে হালদারের দোকানের আঁশটে গন্ধই স্বাভাবিক,
বাইকের গর্জনই ঘুমপাড়ানি গান।

সে আমাদের মতো করে গ্রামকে খুঁজবে না,
সে এই ধুলোতেই খুঁজে নেবে তার খেলার মাঠ।
তার কাছে গুগল ম্যাপের ঠিকানাটাই হবে সত্যি,
আমাদের মুখের গল্পগুলো নয়।

সে যখন বড় হবে,
সে কি নিজেকে বাঙালি বলবে, নাকি দিল্লিবাসী?
নাকি সে হবে এই দুই পরিচয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা
এক নতুন মানুষ,
যার শিকড় এই তেত্রিশ ফুটের কংক্রিটের গভীরে?

----------------


কাগজের নৌকা

আমার কবিতাগুলো আসলে কাগজের নৌকার মতো।
প্রতিদিন বানাই, আর ভাসিয়ে দিই
এই তেত্রিশ ফুটের ধুলোর নদীতে।

কিছু নৌকা জাঠ যুবকের বাইকের চাকায় পিষ্ট হয়,
কিছু আটকে যায় চায়ের দোকানের সামনে,
কিছু হয়তো কোনো শিশুর হাতে পড়ে ছিঁড়ে যায়।

তবু আমি রোজ ভাসাই।
এই ভেবে যে, কোনো একদিন হয়তো
একটা নৌকা হলেও ঠিক ভেসে ভেসে পৌঁছে যাবে
এমন এক পাঠকের কাছে,
যে এই ভাঙ্গাচোরা গলির ধুলো মাঝে খুঁজে পাবে 
একফোঁটা জলের মমতা।


-------------



রিকশার ঘণ্টি

এখানে রিকশার ঘণ্টিগুলো বড় করুণ সুরে বাজে,
যেন ক্লান্ত, অবসন্ন।
তারা বয়ে নিয়ে চলে বাজারফেরত মাসিমা,
স্কুলপালানো শিশু, আর আমাদের মতো কিছু
অফিসফেরত পরিযায়ী।

প্রতিটা প্যাডেলে লেগে থাকে ঘাম আর রুজির গল্প,
প্রতিটা ক্রিং ক্রিং শব্দে মিশে থাকে এক আবেদন—
"পথ ছাড়ো, একটু জায়গা দাও।"
আমরাও তো মনে মনে এই কথাই বলি,
শুধু আমাদের কোনো ঘণ্টি নেই।

তেত্রিশ ফুটের এই ব্যস্ততার সমুদ্রে
রিকশার ঘণ্টিগুলো যেন 
এক একটা অসহায় লাইফবোট,
ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের রোজকার ভার।

-------------


ব্যালকনির ভূগোল

আমাদের ব্যালকনিগুলো 
এক একটা ছোট ছোট দেশ।
কারও দেশে শুকায় গামছা, কারও জিন্স।
কারও টবে ফোটে গাঁদা, কারও মানিপ্ল্যান্ট।
এই ব্যালকনিগুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে,
কিন্তু তাদের মধ্যে অদৃশ্য এক বর্ডার লাইন।

মাঝে মাঝে কথা হয়— "দিদি, নুন হবে একটু?"
কিংবা, "আজ আপনাদের ঘরে ইলিশ রান্না হচ্ছে বুঝি?"
এই ছোট ছোট সেতুগুলো দিয়ে
আমরা একে অপরের দেশে উঁকি মারি।
তবু দিনশেষে, ব্যালকনিটা একান্তই নিজের—
নিজের একাকিত্ব, নিজের আকাশ আর
মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া 
প্লেন দেখার ব্যক্তিগত জানালা।

-------------------


ধুলো-দর্শন

এখানকার বাতাসে ধুলো ওড়ে—
নির্মাণাধীন বাড়ির, দ্রুতগামী বাইকের, 
আর সময়ের ধুলো।
এই ধুলো আমাদের চুলে, বইয়ের পাতায়,
চায়ের কাপে এসে বসে।

এই ধুলো আসলে একটা প্রলেপ,
যা আমাদের আসল রঙকে ঢেকে দেয়।
আমাদের ভেতরের গ্রাম, আমাদের ভেতরের নদী—
সবকিছুর ওপর একটা ধূসর আস্তরণ।

তেত্রিশ ফুট জুড়ে এই ধুলোর রাজত্ব।
আমরা এই ধুলোর মধ্যেই শ্বাস নিই, স্বপ্ন দেখি,
আর অপেক্ষা করি এক পশলা বৃষ্টির—
যা ধুলো ধুইয়ে দিয়ে আমাদের আসল মুখটা
এক মুহূর্তের জন্য হলেও ফিরিয়ে দেবে
আমার  শৈশবের বঙ্গপ্রদেশ ।

--------------------


ঘুড়ির লড়াই

বিকেলে মাঝে মাঝে আকাশে ঘুড়ি ওড়ে,
কাটাকাটির লড়াই চলে।
একটা ঘুড়ি কেটে গেলে 
যেমন অসহায়ভাবে ভাসতে ভাসতে
অজানা কোনো ছাদে গিয়ে পড়ে,
আমাদের অবস্থাও কি অনেকটা সেরকম?

আমরাও তো এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা,
জীবনের লড়াইয়ে কেটে গিয়ে
উড়ে এসেছি এই অচেনা ছাদে।
এখন এখানেই আমাদের আশ্রয়, 
এখানেই পতন।

তেত্রিশ ফুটের ওপর দিয়ে 
যখন একটা কাটা ঘুড়ি ভেসে যায়,
আমার মনে হয়, ওটা আমারই প্রতিচ্ছবি—
মুক্ত, কিন্তু লক্ষ্যহীন। 
স্বাধীন, কিন্তু শিকড়হীন।

--------------

জলের লাইন

সকালে যখন টাইম-কলের জল আসে,
প্লাস্টিকের বালতি আর ড্রামের সারি পড়ে যায়।
একটা লাইনে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই সমান—
বাঙালি, জাঠ, বিহারি।
আমাদের সবার একটাই চিন্তা—
জল পাওয়া যাবে তো?

এই জলের লাইনে দাঁড়িয়ে যে কথোপকথন হয়,
তাতে কোনো কবিতা থাকে না, 
কার ঘরে কে অসুস্থ, 
বাজারে কীসের দাম বাড়লো—
সব খবর বিনিময় হয়।
কিছুক্ষণের জন্য আমরা হয়ে উঠি এক বৃহৎ পরিবার,

জল চলে গেলে, লাইন ভেঙে গেলে, 
আমরা আবার আলাদা হয়ে যাই।

---------------------


গন্ধের রাজনীতি

আমাদের রান্নাঘরের মশলার গন্ধ
যখন ওদের নাসারন্ধ্রে পৌঁছায়,
ওদের চোখে কি ফুটে ওঠে প্রশ্ন, নাকি কৌতূহল?
ওদের রান্না করা ছোলে-ভাটুরের তীব্র গন্ধ
যখন আমাদের ঘরে ঢোকে,
আমরা কি দরজা বন্ধ করে দিই?

গন্ধেরও একটা রাজনীতি আছে, 
একটা সীমানা আছে।
এক একটা গন্ধ এক একটা পরিচয়ের পতাকা ওড়ায়।
তেত্রিশ ফুটের এই পরিসরে
নানা গন্ধের সহাবস্থান—
কখনো শান্তিপূর্ণ, কখনো যুদ্ধংদেহী।
এই গন্ধের মানচিত্র দিয়েই চেনা যায়,
কোন দরজাটা কার, 
কোন জানালাটা কোন প্রদেশের।

------------------

ভাঙা খেলনা

গলির মোড়ে মাঝে মাঝে পড়ে থাকে ভাঙা খেলনা—
একটা গাড়ির চাকা, একটা পুতুলের হাত।
শিশুরা খেলতে খেলতে ভুলে গেছে, 
কিংবা ফেলে দিয়েছে।
আমার মনে হয়, আমরাও সেরকমই।

আমাদের স্বপ্নগুলোও ছিল 
এক একটা রঙিন খেলনা।
জীবনের পথে চলতে চলতে কিছু ভেঙে গেছে,
কিছু হারিয়ে গেছে।
এখন শুধু তার ভাঙা অংশগুলো কুড়িয়ে নিয়ে
আমরা বেঁচে থাকার অভিনয় করি।

তেত্রিশ ফুটের এই রাস্তায় পড়ে থাকা ভাঙা খেলনাটা
শুধু একটা আবর্জনা নয়,
ওটা আমাদের সবার ফেলে আসা 
শৈশবের স্মৃতিস্তম্ভ।

----------------------

ভাষার দেয়াল

ওরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলে,
সেই ভাষার কাঠিন্য আর গতি 
আমাদের কাছে দুর্বোধ্য।
আমরা যখন নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলি,
ওদের কাছেও কি তা সমান অচেনা লাগে?

ভাষা এখানে একটা দেয়াল, যা দেখা যায় না,
কিন্তু অনুভব করা যায়।
এই দেয়ালের ওপার থেকে আমরা ওদের দেখি,
ওরা আমাদের দেখে।
মাঝে মাঝে কিছু শব্দ এই দেয়াল টপকে যায়—
'নমস্তে', 'কেমন আছো', 'থ্যাঙ্ক ইউ'।
এই ধার করা শব্দগুলো দিয়েই আমরা
একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখি।


---------------


আগামীকালের সকাল

আজ রাতেও তেত্রিশ ফুট ঘুমিয়ে পড়বে,
ক্লান্ত, শান্ত, ধুলোমাখা।
কিন্তু কাল সকালে আবার জেগে উঠবে—
সেই একই কোলাহল, একই ব্যস্ততা, 
একই অফিস যাত্রা।
হালদার আবার মাছ নিয়ে বসবে,
ভোলা বাবু আবার চা বানাবে,
জাঠ যুবক আবার বাইক ছোটোবে।


এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেই জীবন।
এখানে নাটকীয় কিছু নেই, 
মহাকাব্যিক কিছু নেই।
আছে শুধু টিকে থাকার একঘেয়ে, কিন্তু জরুরি লড়াই।
আর আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখব
আরও একটা সকালের জন্ম,
আর আমার কবিতার খাতায় যোগ হবে
আরও একটা লাইন, আরও একটা শব্দ।

------------------



তারের জঙ্গল

আমাদের আকাশের একটা বড় অংশ জুড়ে
জট পাকিয়ে আছে কালো কালো তার—
ইলেকট্রিক, কেবল, ইন্টারনেট।
যেন এক আধুনিক জঙ্গল, যার ডালে ডালে
বয়ে চলেছে তথ্য, বিনোদন আর বিদ্যুৎ।

এই তারগুলো আমাদের জীবনের মতোই—
জটিল, জট পাকানো, 
কোনটা যে কার সাথে যুক্ত, বোঝা মুশকিল।
মাঝে মাঝে কোনো পাখি এসে বসে,
তখন মনে হয়, এই কংক্রিটের জঙ্গলেও
একটুখানি প্রাণের স্পন্দন আছে।

তেত্রিশ ফুটের আকাশটা এই তারের জালে ঢাকা,
তাই আমরা পুরো আকাশটা দেখতে পাই না।
আমাদের স্বপ্নগুলোও আটকে আছে
এই তারগুলোর জটিলতায় ।

--------------------



ভোরের ফেরিওয়ালা

ভোর হওয়ার আগে, যখন রাস্তাটা প্রায় জনশূন্য,
একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—"সবজি লে লো..."
তার সাইকেলের পেছনে বাঁধা থাকে শিশিরভেজা সবজি,
আর তার গলায় লেগে থাকে সারা রাতের ক্লান্তি।

সে এই পাড়ার প্রথম জাগরণ, প্রথম শব্দ।
তার হাঁক শুনেই ঘুম ভাঙে অনেকের।
সে আমাদের জন্য নিয়ে আসে মাটির সতেজতা,
এই কংক্রিটের মরুভূমিতে এক টুকরো সবুজ।

সে জানে না, তার এই সাধারণ হাঁকডাক
আমার কাছে কবিতার মতো শোনায়—
জীবনের কবিতা, বেঁচে থাকার কবিতা,
যা এই তেত্রিশ ফুটের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে যায় 
প্রতিদিন ।


--------------

দেয়ালের ঘড়ি

প্রতিটা ফ্ল্যাটের ভেতরে একটা করে 
দেয়াল ঘড়ি আছে,
তারা নিজের নিজের সময় দিয়ে চলে—টিক্ টিক্ টিক্।
কিন্তু তেত্রিশ ফুটের নিজের কোনো ঘড়ি নেই,
তার সময় মাপা হয় অন্যভাবে।

সকালের আজান, কালীবাড়ির সন্ধ্যারতি,
স্কুলবাসের হর্ন, 
আর রাতে ফেরা শেষ মানুষটির পায়ের শব্দ—
এগুলোই এই রাস্তার ঘড়ি।
এর কোনো মিনিট বা সেকেন্ডের কাঁটা নেই,
আছে শুধু জীবনের প্রবাহ, ঘটনার স্রোত।

আমরা নিজেদের ঘড়ি মিলিয়ে নিই,
কিন্তু দিনশেষে এই রাস্তার সময়ের সাথেই
আমাদের জীবন বাঁধা।

----------------


নামহীন দোকান

গলির ভেতরে এমন কিছু দোকান আছে,
যাদের কোনো নাম নেই, কোনো সাইনবোর্ড নেই।
শুধু একটা টুলের ওপর কয়েকটা বিস্কুটের প্যাকেট,
বা একটা ঝুড়িতে কয়েকটা ডিম।

তাদের মালিকেরা চুপচাপ বসে থাকে,
যেন তারা দোকানের অংশ নয়, পটভূমির অংশ।
তবু তাদের ঘিরে একটা বিশ্বস্ততা আছে,
জরুরি প্রয়োজনে তারাই ভরসা।

এই নামহীন দোকানগুলো 
আমাদের মতো মানুষদের প্রতীক—
যাদের এই শহরে কোনো বড় পরিচয় নেই,
তবু আমরা এই শহরের কাঠামোকে ধরে রাখি,
নীরবে, নিজের নিজের জায়গায়।
তেত্রিশ ফুটের শরীর জুড়ে এমন 
অনেক নামহীন নাম 
অনেক কবিতাহীন কবি ।

-----------------


উৎসবের আলো

দীপাবলির সময় তেত্রিস ফুট আলোয় সেজে ওঠে,
প্রতিটা বাড়ি, প্রতিটা ব্যালকনি—
টুনি লাইটের মালায় ঝলমল করে।
তখন আর বোঝা যায় না, কোনটা জাঠের বাড়ি, কোনটা বাঙালির।
আলোর কোনো ধর্ম বা প্রদেশ থাকে না।

পটকার শব্দে কান পাতা দায় হয়,
ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ।
তবু এই আলোর বন্যায় আমরা সবাই একসাথে ভাসি,
একসাথে উদযাপন করি।
এই কয়েকটা দিনের জন্য আমরা সবাই শুধু "প্রতিবেশী"।
উৎসব ফুরিয়ে গেলে, আলো নিভে গেলে,
আমরা আবার নিজেদের খোলসে ঢুকে পড়ি।

--------------


৩৭. পুরোনো খবরের কাগজ

রবিবার সকালে ফেরিওয়ালা আসে—"পুরোনো কাগজ..."
আমরা জমিয়ে রাখা খবরের কাগজ, ভাঙা বোতল বিক্রি করি।
এই কাগজগুলোর মধ্যে শুধু খবর নেই,
আছে আমাদের গত সপ্তাহের সময়, আমাদের ফেলে আসা দিন।

কোনো পাতায় হয়তো চায়ের দাগ,
কোনো পাতায় বাচ্চার আঁকিবুকি।
এই পুরোনো কাগজগুলো বিক্রি করার সময়
মনে হয়, আমরা যেন নিজেদেরই একটা অংশ বিক্রি করে দিচ্ছি।
কয়েকটা টাকার বিনিময়ে আমরা নিজেদের স্মৃতিকে বিদায় জানাই।
তেত্রিশ ফুটের ওপর দিয়ে সেই স্মৃতি সাইকেলে করে চলে যায়।

৩৮. মধ্যবিত্তের স্বপ্ন

এখানে আমাদের স্বপ্নগুলোও খুব মধ্যবিত্ত।
ছেলেমেয়ের ভালো রেজাল্ট, একটা ছোট গাড়ি কেনা,
কিংবা গ্রামের বাড়িতে একটা পাকা ঘর তোলা।
আমাদের স্বপ্নগুলো আকাশছোঁয়া নয়,
মাটির কাছাকাছি, নাগালের মধ্যে।

আমরা EMI-এর অঙ্ক কষি, বাচ্চার স্কুলের ফি জমা দিই,
আর তার ফাঁকে একটু একটু করে স্বপ্ন বুনি।
এই স্বপ্নগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে,
এই তেত্রিশ ফুটের ধুলো আর কোলাহলের মধ্যে
এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়।
আমাদের স্বপ্নগুলো এই রাস্তার মতোই—সাধারণ, কিন্তু খুব জীবন্ত।

৩৯. অচেনা মুখ

প্রতিদিনই এই রাস্তায় কত অচেনা মুখ দেখি—
কাজের খোঁজে আসা শ্রমিক, আত্মীয়ের বাড়ি আসা অতিথি,
কিংবা ভুল করে ঢুকে পড়া কোনো পথচারী।
তারা আসে, কিছুক্ষণ থাকে, তারপর মিলিয়ে যায়।

তাদের চোখে থাকে বিস্ময়, কৌতূহল, কিংবা বিভ্রান্তি।
তাদের কাছে এই রাস্তাটা একটা গোলকধাঁধা।
আমরা যারা এখানে থাকি, আমরা তাদের দেখি,
আর ভাবি, আমরাও তো একদিন এমনই অচেনা ছিলাম।
কবে যে এই রাস্তাটা আমাদের মুখ চিনে ফেললো,
আর আমরা চিনে ফেললাম এর প্রতিটি বাঁক!

৪০. নৈঃশব্দ্যের মুহূর্ত

মাঝরাতে, কিংবা ভরদুপুরে,
কখনো কখনো এমন একটা মুহূর্ত আসে,
যখন তেত্রিশ ফুট হঠাৎ করে চুপ হয়ে যায়।
কোনো গাড়ি নেই, কোনো হর্ন নেই, কোনো মানুষের গলা নেই।
এক অদ্ভুত, গভীর নৈঃশব্দ্য।



সেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়,
সময় যেন থেমে গেছে।
শুধু শোনা যায় নিজের হৃৎস্পন্দন,
আর হয়তো দূরে কোনো ঘুঘুর ডাক।
সেই নৈঃশব্দ্যটা এই রাস্তার আসল আত্মা—
ক্লান্ত, শান্ত, আর হয়তো একটু বিষণ্ণ।
তারপরই আবার একটা বাইকের শব্দে সেই মৌনতা ভেঙে যায়।



৪১. ছাদের আকাশ

আমাদের ফ্ল্যাটের ছাদগুলো শুধু জলট্যাঙ্কের আস্তানা নয়,
ওগুলো আমাদের মুক্তির এক টুকরো আকাশ।
বিকেলে কাপড় তুলতে গিয়ে, কিংবা শীতের সকালে রোদ পোহাতে গিয়ে
আমরা যে আকাশটা দেখি, তা একান্তই আমাদের।

ওখানে দাঁড়িয়ে দেখলে তেত্র फ्रैक्शंस ফুটের কোলাহলটা অনেক দূরে মনে হয়।
তখন শুধু দেখা যায় উড়ন্ত পাখি, ভেসে যাওয়া মেঘ,
আর দূরের উড়োজাহাজ।
ছাদগুলো আমাদের ব্যক্তিগত দ্বীপ,
যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা এই কংক্রিটের সমুদ্র থেকে
একটু দম ফেলার সুযোগ পাই।
প্রতিবেশীর ছাদের সাথেও একটা নীরব সম্পর্ক তৈরি হয়—
শুধু চোখে চোখে, ইশারায়।

৪২. গলির ক্রিকেট

ছুটির দুপুরে তেত্রিশ ফুটের কোনো একটা অংশ
হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে ক্রিকেট স্টেডিয়াম।
ইঁট দিয়ে বানানো উইকেট, প্লাস্টিকের বল,
আর একদল কিশোরের উদ্দাম চিৎকার।

তাদের কাছে এই রাস্তাই লর্ডস, এই গলিই ইডেন।
গাড়ির হর্ন তাদের কাছে আম্পায়ারের ধমক,
আর প্রতিবেশীর জানলার কাঁচ ভাঙার ভয়—थर्ड मैन-এর টেনশন।
তাদের এই খেলায় মিশে থাকে এক আশ্চর্য প্রাণশক্তি,
যা এই ধুলোমাখা, ক্লান্ত রাস্তাটাকে মুহূর্তে জাগিয়ে তোলে।
তাদের "আউট! আউট!" চিৎকারে আমরা আমাদের শৈশবকে খুঁজে পাই।

৪৩. জলের ট্যাঙ্কার

গ্রীষ্মের দুপুরে যখন জলের সঙ্কট তীব্র হয়,
তখন ত্রাতার মতো আসে নীল রঙের জলের ট্যাঙ্কার।
মানুষের ভিড়, বালতি আর পাইপের হুড়োহুড়ি—
সে এক অন্য যুদ্ধ।

জলের জন্য এই আকুতি দেখলে বোঝা যায়,
জীবন কতটা মৌলিক, কতটা আদিম।
ভাষার বিভেদ, প্রদেশের দূরত্ব—সব মুছে যায়
এক ফোঁটা জলের প্রয়োজনে।
ট্যাঙ্কারের জল যখন বালতিতে পড়ে, সেই শব্দটা
যেন অমৃতের বর্ষণ।
জল ফুরোলে, ট্যাঙ্কার চলে গেলে,
আমরা আবার হয়ে যাই সেই বিচ্ছিন্ন, আলাদা মানুষ।

৪৪. দেওয়ালে গজানো বট

পুরোনো বাড়ির দেয়ালের ফাটলে
কেমন করে যেন একটা বট চারা জন্মেছে।
তার শিকড়গুলো ধীরে ধীরে ইঁট আর সিমেন্টের গভীরে প্রবেশ করছে,
যেন এই নিষ্প্রাণ কাঠামো থেকেও সে জীবন শুষে নিতে চায়।

এই বট চারাটা আমাদের মতোই—
অপ্রত্যাশিত, তবু টিকে থাকার জেদে ভরপুর।
আমরাও তো এই শহরের ফাটলে নিজেদের শিকড় চালানোর চেষ্টা করছি,
এই অচেনা মাটি থেকে রসদ খুঁজে নিচ্ছি।
হয়তো একদিন আমরাও এই দেয়ালটাকে ফাটিয়ে দেবো,
কিংবা দেয়ালটাই আমাদের অস্তিত্বকে গ্রাস করবে।

৪৫. রাতজাগা আলো

রাত গভীর হলে যখন বেশিরভাগ বাড়ির আলো নিভে যায়,
কিছু কিছু জানলায় তখনও আলো জ্বলে।
কেউ হয়তো পরীক্ষার জন্য পড়ছে,
কেউ হয়তো দূরের প্রিয়জনের সাথে কথা বলছে,
কেউ বা হয়তো অসুস্থ, কিংবা নিছকই নিদ্রাহীন।

এই একলা জেগে থাকা আলোগুলো
যেন রাতের আকাশে এক একটা নিঃসঙ্গ নক্ষত্র।
তারা একে অপরকে দেখতে পায়, কিন্তু ছুঁতে পারে না।
আমি আমার ব্যালকনি থেকে ঐ আলোগুলো দেখি,
আর ভাবি, ঐ আলোর ওপারেও আমার মতোই
কোনো এক রাতজাগা আত্মা বসে আছে,
এই তেত্রিশ ফুটের নৈঃশব্দ্যের সাক্ষী হয়ে।

৪৬. ভ্যানগাড়ির জীবন

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কত ভ্যানগাড়ি আসে আর যায়—
সবজিওয়ালা, ফলওয়ালা, বাসনওয়ালা, আখের রসওয়ালা।
তাদের ভ্যানগাড়িগুলোই তাদের চলমান দোকান, তাদের পৃথিবী।
তাদের জীবন এই চাকার সাথেই ঘোরে।

তাদের হাঁকডাকে মিশে থাকে ঋতুর বদল—
শীতে আসে কমলালেবু, গ্রীষ্মে আসে তরমুজ।
তারা এই রাস্তার জীবন্ত ক্যালেন্ডার।
তাদের ঘামে ভেজা মুখ, ক্লান্ত শরীর
এই তেত্রিশ ফুটের শ্রম আর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
তারা আসে, তাদের প্রয়োজন মেটায়, তারপর মিলিয়ে যায়—
ঠিক যেন আমাদের জীবনে আসা ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তগুলোর মতো।

৪৭. মশা ও কয়েল

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই শুরু হয় মশার গুঞ্জন,
আর তার সাথে জ্বলে ওঠে সবুজ রঙের কয়েল।
কয়েলের ধোঁয়ায় মিশে থাকে এক অদ্ভুত গন্ধ—
বিষাক্ত, কিন্তু সুরক্ষার।

এই ধোঁয়াটা যেন একটা অদৃশ্য পর্দা তৈরি করে,
বাইরের আক্রমণ থেকে আমাদের বাঁচানোর জন্য।
আমরাও কি নিজেদের চারপাশে এমন অদৃশ্য কয়েল জ্বালিয়ে রাখি?
অবিশ্বাস, সংশয় আর দূরত্বের ধোঁয়া দিয়ে
আমরা কি নিজেদের সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করি?
এই তেত্রিশ ফুটের প্রতিটা ঘরেই হয়তো এমন এক একটা
মানসিক কয়েল জ্বলে রোজ সন্ধ্যায়।

৪৮. ফেলে দেওয়া আসবাব

মাঝে মাঝে রাস্তার কোণে কেউ ফেলে দিয়ে যায়
পুরোনো, ভাঙা আসবাব—একটা চেয়ার, একটা টেবিলের পায়া,
কিংবা একটা ছেঁড়া সোফা।
ওগুলো একসময় কোনো ঘরের অংশ ছিল, কোনো পরিবারের সাক্ষী ছিল।
এখন তারা পরিত্যক্ত, স্মৃতিহীন।

এই ফেলে দেওয়া আসবাবগুলো দেখলে আমার ভয় হয়।
একদিন আমাদেরও কি এভাবেই প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে?
আমরাও কি এই শহরের কোনো এক কোণে
স্মৃতিহীন, পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকব?
তেত্রিশ ফুটের এই রাস্তায় পড়ে থাকা ভাঙা চেয়ারটা
শুধু আবর্জনা নয়, ওটা একটা অস্তিত্বের সংকট।

৪৯. ভাড়াটিয়ার পরিচয়

এখানে আমাদের পরিচয় শুধু একটা ফ্ল্যাট নম্বর দিয়ে—
'বি-টু', 'থ্রি জিরো ফোর', কিংবা 'সেকেন্ড ফ্লোর'।
আমাদের নাম, আমাদের পদবি, আমাদের গ্রাম—
সবকিছু এই সংখ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

চিঠি আসে এই সংখ্যায়, ডেলিভারি বয় খোঁজে এই সংখ্যায়।
আমরা ধীরে ধীরে মানুষ থেকে একটা ঠিকানায় পরিণত হই।
এই সংখ্যাটা আমাদের সুরক্ষা দেয়, আবার একাকীত্বও দেয়।
এই তেত্রিশ ফুটের মানচিত্রে আমরা সবাই
এক একটা সংখ্যা মাত্র, এক একটা বিন্দু।

৫০. নীরব প্রার্থনা

প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময়
আমি মনে মনে একটা নীরব প্রার্থনা করি।
প্রার্থনা করি, যেন কোনো গাড়ির ধাক্কা না লাগে,
যেন ছেলেমেয়েরা নিরাপদে স্কুল থেকে ফেরে,
যেন পাশের বাড়ির অসুস্থ বৃদ্ধা সুস্থ হয়ে ওঠেন।



এই প্রার্থনা কোনো মন্দিরে বা মসজিদে নয়,
এই প্রার্থনা এই ধুলোমাখা পথেই।
আমার মতো হয়তো আরও অনেকেই এমন নীরব প্রার্থনা করে।
এই ছোট ছোট, অব্যক্ত প্রার্থনাই হয়তো
এই সমস্ত কোলাহল আর সংঘাতের মধ্যেও
তেত্রিশ ফুটকে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে,
একসাথে বেঁধে রেখেছে।



৫১. ল্যান্ডমার্ক

নতুন কাউকে ঠিকানা বোঝাতে গেলে
আমরা বলি—"ওই মনুময় কাফের গলিটা",
কিংবা "ডাক্তারবাবুর ক্লিনিকের ঠিক উল্টোদিকে"।
এখানে দোকান, ক্লিনিক বা কোনো পুরোনো বাড়িই আমাদের ল্যান্ডমার্ক।

এই ল্যান্ডমার্কগুলো শুধু পথের চিহ্ন নয়,
ওগুলো আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির নোঙর।
ওদের ঘিরেই আমাদের গল্প তৈরি হয়, আমাদের পরিচয় গড়ে ওঠে।
যদি কোনোদিন মনুময় কাফে উঠে যায়,
আমরা কি আমাদের পথ হারিয়ে ফেলব?
নাকি আমাদের স্মৃতিতে একটা শূন্যস্থান তৈরি হবে,
যা আর কিছু দিয়েই পূরণ করা যাবে না?

৫২. সাইকেলের ছেলেটা

প্রতিদিন সকালে একটা ছেলে সাইকেলে করে খবরের কাগজ দিয়ে যায়।
তার সাইকেলের ঘণ্টি বাজে না,
শুধু বারান্দায় কাগজটা পড়ার একটা শব্দ হয়—থুপ্।
সেই শব্দেই আমাদের সকাল শুরু হয়।

আমরা তার মুখটা ভালো করে দেখি না, তার নামও জানি না।
সে আমাদের কাছে শুধু একটা রুটিন, একটা শব্দ।
সে হয়তো আমাদের মতোই কোনো পরিযায়ী পরিবারের সন্তান,
পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজ করে।
তার সাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে সে শুধু কাগজ বিলি করে না,
বিলি করে চলে শহরের খবর, দেশের খবর,
আর নিজের স্বপ্নের বোঝা।

৫৩. প্রতিবেশীর রান্না

আমাদের রান্নাঘরের জানলা দিয়ে
মাঝে মাঝে প্রতিবেশীর রান্নার গন্ধ ভেসে আসে।
গন্ধেই বোঝা যায়, আজ ওদের ঘরে কী রান্না হচ্ছে—
রাজমা, কঢ়ি, নাকি আলুর পরোটা।
এই গন্ধগুলো আমাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য সংযোগ তৈরি করে।

আমরা হয়তো সারাদিন কথা বলি না,
কিন্তু এই ঘ্রাণের মাধ্যমে আমরা একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে উঠি।
রান্নাটা আসলে শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়,
ওটা একটা সংস্কৃতির বিনিময়, একটা নীরব সংলাপ।
তেত্রিশ ফুটের বাতাস এই সংলাপ বয়ে নিয়ে বেড়ায়
এক রান্নাঘর থেকে অন্য রান্নাঘরে।

৫৪. পাওয়ার কাট

হঠাৎ করে যখন বিদ্যুৎ চলে যায়,
তেত্রিশ ফুট যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করে।
টিভির শব্দ বন্ধ, पंখার আওয়াজ নেই,
হঠাৎ করে নেমে আসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

মানুষজন ব্যালকনিতে বা দরজার সামনে বেরিয়ে আসে,
শুরু হয় কথাবার্তা—"কখন আসবে কারেন্ট?"
এই অন্ধকারটাই যেন আমাদের এক করে দেয়।
আমরা তখন আর ফ্ল্যাট নম্বরে সীমাবদ্ধ থাকি না,
হয়ে উঠি এক wspólnoty, যারা একসাথে অন্ধকারের মোকাবিলা করছে।
বিদ্যুৎ ফিরে এলে, আমরা আবার নিজের নিজের আলোর জগতে ফিরে যাই।

৫৫. টাইলসের দোকান

রাস্তার ধারে একটা বড় টাইলসের দোকান আছে,
বাইরে সাজানো থাকে ঝকঝকে, মসৃণ টাইলস।
কত রকমের রঙ, কত রকমের ডিজাইন!
ওগুলো দেখলে মনে হয়, যেন স্বপ্নের বাড়ির টুকরো।

আমরা যারা ভাড়া বাড়িতে থাকি,
তারা ঐ টাইলসগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
ওগুলো আমাদের কাছে শুধু পাথর নয়,
ওগুলো স্থায়িত্বের প্রতীক, নিজের একটা বাড়ির প্রতীক।
আমাদের জীবনটা এই ভাঙাচোরা রাস্তার মতো,
আর ঐ টাইলসগুলো আমাদের নাগালের বাইরের এক সুন্দর স্বপ্ন।

৫৬. পথকুকুরের মা

গলির একটা কুকুর সম্প্রতি মা হয়েছে,
কয়েকটা ছোট ছোট ছানা নিয়ে সে এক দোকানের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
তার চোখে সারাক্ষণ এক সতর্ক দৃষ্টি,
সন্তানদের বাঁচানোর জন্য সে পৃথিবীর সবার সাথে লড়তে প্রস্তুত।

তার এই материнский রূপ দেখলে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে,
যিনি আমাদের আগলে রাখতেন সব বিপদ থেকে।
মাতৃত্বের ভাষা কি সব জায়গায় একই?
মানুষ হোক বা পশু, এই অনুভূতিটা কি বিশ্বজনীন?
তেত্রিশ ফুটের এই মা কুকুরটা আমাকে প্রতিদিন এই প্রশ্নটা করে।

৫৭. অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন

যখন একটা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজিয়ে
ছুটে যায় এই রাস্তা দিয়ে,
আমাদের সবার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে।
আমরা সবাই পথ ছেড়ে দিই, মনে মনে প্রার্থনা করি।

সেই মুহূর্তে আমরা ভুলে যাই আমাদের সব ছোটখাটো সমস্যা,
আমাদের সব অভিযোগ।
জীবনের সংকট কতটা আকস্মিক আর ভয়াবহ হতে পারে,
এই সাইরেনের শব্দটা তা মনে করিয়ে দেয়।
অ্যাম্বুলেন্সটা চলে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ ধরে
তার রেশটা থেকে যায়—
এই রাস্তার বাতাসে, আর আমাদের মনে।

৫৮. দেয়ালের পঞ্জিকা

অনেক পুরোনো বাড়ির বাইরে এখনও
একটা বাংলা পঞ্জিকা টাঙানো থাকে,
বাতাসে তার পাতাগুলো ওড়ে।
তারিখগুলো বিবর্ণ, ছবিগুলো অস্পষ্ট।
তবু ওটা ওখানে আছে, যেন সময়ের এক পুরোনো প্রহরী।

এই ডিজিটাল যুগে, মোবাইলের ক্যালেন্ডারের ভিড়ে
ঐ পঞ্জিকাটা যেন এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতীক।
ওটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়,
আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমাদের শিকড় কোথায়।
তেত্রিশ ফুটের এই হিন্দি বলয়ে
ঐ বাংলা পঞ্জিকাটা আমাদের পরিচয়ের এক নীরব ঘোষণা।

৫৯. জলের পাইপলাইন

রাস্তার পাশ দিয়ে যে মোটা জলের পাইপলাইনটা গেছে,
তার গায়ে মাঝে মাঝে ছোট ছোট ফাটল ধরে,
আর সেখান থেকে জল চুঁইয়ে পড়ে।
অনেক শিশু সেই জলে খেলা করে, পথচারী হাত-মুখ ধুয়ে নেয়।

এই চুঁইয়ে পড়া জলটা যেন এই শহরের করুণা,
যা সবার জন্য বরাদ্দ।
আমাদের জীবন থেকেও কি এভাবেই একটু একটু করে
স্নেহ, ভালোবাসা, স্মৃতি চুঁইয়ে পড়ে?
যা হয়তো অন্যদের সামান্য কাজে লাগে,
কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের ভেতরটা শূন্য করে দেয়।
এই পাইপলাইনটা এই শহরের এক বিষণ্ণ রূপক।

৬০. শেষ বিকেলের আলো

দিনশেষে, সূর্য ডোবার আগে,
একটা নরম, সোনালী আলো এসে পড়ে তেত্রিশ ফুটের ওপর।
সেই আলোয় ধুলোগুলোকে সোনার কণার মতো দেখায়,
পুরোনো বাড়িগুলোকে মনে হয় মায়াবী প্রাসাদ,
আর ক্লান্ত মানুষদের মুখেও একটা স্নিগ্ধতা ফুটে ওঠে।



এই আলোটা বেশিক্ষণ থাকে না,
কিন্তু যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ এই রাস্তাকে অপূর্ব সুন্দর করে তোলে।
এই আলোটা যেন একটা প্রতিশ্রুতি—
দিনটা যেমনই কাটুক না কেন, শেষটা সুন্দর হতে পারে।
এই শেষ বিকেলের আলোর দিকে তাকিয়েই হয়তো
আমরা আরও একটা নতুন দিনের জন্য শক্তি সঞ্চয় করি।