তোমারসম্ভবা
তোমারসম্ভবা
-পীযূষকান্তি বিশ্বাস
লাল রং আমার খুব প্রিয় । সকালের লাল আভায় কত না প্রভাত এই ভাবে ভোর হলো । ক্রমশ হলুদ হয়ে ওঠা রাত্রিকাল চোখের পাতায় শুকিয়ে গেলো । লাল আমার রক্তে রক্তে সঞ্চারিত বুঝতে পারি । যা দেখি আজ সমস্তই লাল । এই পাখিদেশ, এই ঝাঁটিবাবলার সুলতানাবাদ , দূর্গ, পরিখা, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া আম জনতা, ছুটে যাওয়া দূরপাল্লার ট্রেন । এই উড়ে যাওয়া পাখি, এই ঘরে ফেরা নদী । তার চর । এই চরাচর । সমস্তই লাল । আমি নিজেই মনে হয় রক্ত রাঙা লাল ।
অথচ এইরকম আগে ছিলো না । অন্তত আমি নিজেই এই সব ভেবে অবাক হই । আমার দুটো চোখ নীল ছিলো । আমি যখন ক্লাস এইট । প্রথমবার পড়ছি সুদূর ঝর্ণার জলে । আমার চোখ নীল মনে হয়েছিলো । আমি নিজেকে সুনীল ভাবতাম । আমি যখন ক্লাস দশ , আমি তখন বায়ুসৈনিক । টাচ দ্যা স্কাই উইথ গ্লোরী । নীল ইউনিফর্ম আমার খুব পছন্দ ছিলো । মনে মনে পোষণ করতাম আমার একটি প্রেমিকা হোক । তার নাম রাখবো নীলিমা দেব । যার জন্য নীল সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে পারি । কোরাল দ্বীপের নীল জলে তার জন্য ভাসিয়ে দিতে পারি পানসি । সেখানে আমাদের নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবী আর পৃথিবীর পরে ওই নীল আকাশ । আমার মনে হতো, আমি একজন গীতিকার হবো । গান লিখে রাখার জন্য আমি নিজস্ব ড্রইয়ারে রেখেছিলাম তিনখানি নীল ডায়েরী ।
রঙ ব্যাপারটা এইভাবে খোলসা কখনো হলো । এই রঙখেলার নিয়ে আমি নিজেই কিছু নিয়মকানুন জানি না । যতটুকু বোঝার প্রচেষ্টা করি । অনুধাবন করি সময়সীমা, মাঠ প্রসঙ্গ, রেফারী ও সম্পর্কিত বাঁশীর ফুঁ । এই রঙ নিয়ে খেলাটায় খিলাড়ির সংখ্যা জানতে ইচ্ছা করি । কতজনের খেলা হবে । দুই ? চার ? অথবা এগারো ? এ কোন ধরনের মাঠ যার কোন গোল পোষ্ট নেই । না আছে বাইশ গজের কোন পিচ । অথচ এইটুকু আমি বুঝি, আমি খেলায় নিজেই স্ট্রাইকার, নিজেই গোলকিপার, নিজেই বোলার, নিজেই ব্যাটসম্যান । বাউন্ডারী বাঁচাতে আমি দৌড়ে যাচ্ছি ডিপ মিড উইকেট । এই ভাবে কি ঘটে গেলো । রং কেন এতো সর্বগ্রাসী হবে ? রঙখেলাই বা কেন এতো সর্বনাশী ?
আমার যেমন হয়, তেমন তোমার ও কি হয়? অসীম সম্ভাবনার খেলা ? তুমিও রঙনীলিমায় অভিভূত হয়ে যাও ? এক এক সময় মনে হয়, রঙ এইটি দৈর্ঘ্য, আবার কখনো মনে হয় প্রস্থ , কখনো মনে হয় তরঙ্গ । সময় দিয়ে যা ধরা যায় না । একটি অখণ্ড আকার যার নিজস্ব মাত্রা নেই ।
সেবার মাত্র এই টিন পার করে যৌবনে পড়েছি । বয়স থেমে থাকে না । পদ্মপাতায় জলের মতো গড়িয়ে যায় । পাহাড়ি এক হ্রদের পাশে পরনে সবুজ টিশার্ট । আশে পাশে যারা দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন , তারা সবাই সবুজ টিশার্ট পরে আছেন । তাদের জুতো, মোজা সমস্তই সবুজ। আমি তো অবাক । একটু ধবন্দ লাগায় দুএকটি চিমটি কেটে বুঝে দেখলাম আমি জাগ্রত কিনা ।